রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে গত এপ্রিলে দুর্ঘটনায় উল্টে পড়েছিল একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি, যার মালিক ওই ঘটনার পরই আরেকটি বিএমডব্লিউ গাড়ি কিনে ফেলেন। গাড়িটির মালিক ২৩ বছরের তরুণ আরিফুল ইসলাম রিফাত। দামি গাড়ি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন নামি হোটেল-রিসোর্টে থাকেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ এ তথ্য জানায়।
আরিফুলসহ অনলাইন জুয়ার কারবারে জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর ডিবি পুলিশ জানায়, এই চক্রের বিলাসী জীবন চলছিল অনলাইন জুয়ার পেমেন্ট কোম্পানি বা অ্যাপ চালিয়ে। এই অ্যাপ কোম্পানির পেছনে রয়েছেন চীনা নাগরিকেরা। অনলাইন জুয়ায় দেশের লোকজন যে পয়সা খোয়ান, তার পুরোটাই চলে যায় চীনাদের পকেটে। আর এর সামান্য অংশ বা শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ কমিশন পেয়েই বিলাসী জীবনযাপন করেন আরিফুলরা।
আরিফুল ছাড়াও গ্রেপ্তার অন্যরা হলেনÑ আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আব্দুর রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)। তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০ মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্ট যুক্ত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, ৭০টির বেশি মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়। গতকাল মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার ছয়জনের ব্যাপারে বিস্তারিত তুলে ধরেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ডিসি তরিকুল ইসলাম বলেন, দেড় বছর ধরে চক্রটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল পুলিশ। অবশেষে গত বুধবার গাজীপুর ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে চক্রটিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা প্রচ- ধুরন্ধর। পুলিশের চোখ এড়াতে তারা বারবার জায়গা বদল করছিলেন।
ডিবি পুলিশ জানায়, বাংলাদেশে জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোর এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দৈনিক ১ হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়। আরিফুল ও তার চক্রটি দেশে ‘গো পে’ নামে একটি পেমেন্ট কোম্পানির হয়ে কাজ করছিল। আরিফুলই এর হোতা। তার বিরুদ্ধে আগের চারটি মামলা রয়েছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস পরিচালনায় অনেকগুলো পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে। বাংলাদেশকেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে যেসব পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে, তার অধিকাংশই চীনা নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে। এসব পেমেন্ট কোম্পানির দেশে ব্যবসার জন্য স্থানীয় প্রচলিত লেনদেনের মাধ্যম প্রয়োজন হয়। সে জন্য অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। ব্যাংকের তুলনায় সহজলভ্য এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পেমেন্ট কোম্পানি এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকে।
ডিবি-প্রধান বলেন, জুয়ার সাইট এবং অ্যাপ চালানোর জন্য সাধারণত এমএফএস এজেন্ট অ্যাকাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। এসব এজেন্ট অ্যাকাউন্টে হওয়া লেনদেন দিন শেষে হিসাব করে প্রাপ্ত লভ্যাংশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস পারসোনাল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। পারসোনাল অ্যাকাউন্টগুলোতে পাঠানো অর্থ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ক্রিপ্টো ডলার কেনা হয়। পরবর্তীতে পেমেন্ট কোম্পানির ওয়ালেট অ্যাড্রেসে ওই ক্রিপ্টো ডলার পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে জুয়ার সাইট ও অ্যাপগুলোর পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০ পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে থাকে। এসব কোম্পানির একেকটির প্রতিদিনের লেনদেন কয়েক কোটি টাকার ওপরে। গ্রেপ্তার আসামিরা ‘গো পে’ পেমেন্ট কোম্পানির হয়ে কাজ করছিলেন, যার নিয়ন্ত্রণ চীনাদের হাতে। ‘গো পে’র লেনদেন ৫ কোটি টাকার ওপরে। আরিফুল ও তার সহযোগীরা মূলত চীনা নাগরিকের এজেন্ট হয়ে বাংলাদেশে কাজ করেন। ওই চীনা নাগরিকেরা একসময় বাংলাদেশেই থাকতেন। তবে এখন তারা চীনে অবস্থান করেই বাংলদেশে কোম্পানি চালাচ্ছেন।
আরিফুলের দেওয়া তথ্যের বরাতে গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, পেমেন্ট কোম্পানিগুলো প্রতিদিনের মোট লেনদেনের শূন্য দশমিক ২ থেকে ১ শতাংশ টাকা আরিফুলদের দিত। এই অর্থের ৫০ শতাংশ ভেন্ডরদের দিতেন আরিফুল। বাকি টাকার ভাগের অংশ এমএফএস অ্যাকাউন্টের এজেন্ট, ডিএসও (এমএফএস বিক্রয় কর্মকর্তা), সুপারভাইজার এবং ক্ষেত্রবিশেষে হাউস ম্যানেজার, মালিক এবং এমএফএস কর্তৃপক্ষের লোকজনও পেয়ে থাকেন বলে তথ্য রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আরিফুলরা কমিশন হিসেবে যে টাকা পান, তার বাইরে তাদের জীবনযাত্রা-সংক্রান্ত সব খরচ (আবাসন, খাবার, যাতায়াতসহ নানা কিছু) ওই কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে। রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে গত এপ্রিল মাসে নীল রঙের বিএমডব্লিউ গাড়ি উল্টে পড়ে থাকার ঘটনা টেনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, গাড়িটি ছিল আরিফের। এরপর তিনি আরেকটি সাদা রঙের বিএমডব্লিউ গাড়ি কেনেন। তিনি খুবই বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। তাকে রিসোর্টের যে কক্ষ থেকে ধরা হয়েছে, তার প্রতিদিনের ভাড়া ৫০ হাজার টাকা। তার কৌশল হচ্ছে, তিনি কখনো ঢাকায়, কখনো গাজীপুরে বা কক্সবাজারে নামি-দামি হোটেলে থাকেন। তিন-চারদিন পরেই আবার অন্য জায়গায় চলে যান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই কৌশলেই চলছিলেন।
পুলিশ বলছে, এসব থেকেই তাদের মাসিক আয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ওই বিলাসবহুল গাড়িগুলো উদ্ধার এবং চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান এখনো চলছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন