ফ্যাসিবাদ পতনে নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। তারেক রহমানের হাত ধরে যে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েছিল, তার কাছাকাছি মেয়াদ এখন সরকারে। কিছু সমালোচনা থাকলেও মোটা দাগে সরকার মানুষের মন জয় করতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই জানা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে। নতুন সরকারের পথচলার ৫ মাস কিংবা ১৫০ দিন পূর্ণ করেছে বড় কোনো জটিলতা ছাড়া। সরকারের মুখপাত্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরাচারী কাঠামোর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মাত্র ৫ মাসে সরকার যে বহুমুখী সংস্কার, আইনি পদক্ষেপ এবং জনবান্ধব কর্মসূচির সূচনা করেছে, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। সরকার গঠন ও দায়িত্ব গ্রহণের পর পাঁচ মাসে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক খাতকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন।
সরকারের এই ৫ মাসের পথচলাকে দেশের অগ্রণী রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা কীভাবে দেখছেন? বিশ্লেষকদের মতে, সরকার একদিকে যেমন গণআকাক্সক্ষাকে ধারণ করে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তেমনই সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার মতো জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, নতুন সরকার সেখানে একটি বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিতে পেরেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের ৫ মাস পূর্তি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে ড. মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসে সম্পন্ন করার নজির তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। অপরাধ করে আর পার পাওয়া যাবে না। সরকারের এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)সহ দেশের মানুষ। তারা বলছেন, দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিতের এই নজির সাধারণ মানুষের মনে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে। তবে এমন স্বস্তির মাঝে সাধারণের মাঝে অস্বস্তি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি না হলেও উন্নতি যে হয়নি সেটি বলাই চলে। ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে শুধু চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরই নয়Ñ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে চাঁদাবাজিও। ব্যবসায়ীদের কপালে তাই চিন্তার ভাঁজ। সরকার দ্রুত আইনশৃঙ্খলার উন্নতিতে মনোযোগী হবে বলে আশা সাধারণ মানুষের। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ফ্যাসিবাদ আমলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে কতদূরই বা যেতে পারবে সরকার।
একই সঙ্গে, দীর্ঘ ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে গোয়েন্দা সংস্থা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে প্রত্যর্পণ এবং আওয়ামী লীগের প্রাতিষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়ার মতো সংবেদনশীল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে সরকারকে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে।
অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি : প্রবৃদ্ধির সুবাতাস, তবে বাজার এখনো সংবেদনশীল : অর্থনৈতিক খাতে সরকারের ৫ মাসের পারফরম্যান্সকে মিশ্র কিন্তু ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফলে মূল্যস্ফীতি ৯.১৬ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬.৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করাকে বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার বাজারে একটি বড় স্বস্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ। গত মার্চ মাসে রেকর্ড ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসার ঘটনাকে সরকারের প্রতি প্রবাসীদের গভীর আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি মন্তব্য করেন, ‘‘শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে যে শ্রমশক্তি রপ্তানির সূচনা হয়েছিল, বর্তমান সরকার ‘প্রবাসী কার্ড’ ও রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে তাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির এই সুবাতাস যেন সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।”
অন্যদিকে, ২৬% রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন আর্থিক খাতকে চাঙ্গা করতে শুরু করেছে। তবে ১৫৯ বছরের পুরোনো আইন বাতিল করে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ পাস এবং অনলাইন জুয়া ও ক্রিপ্টোকারেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে সমাজবিজ্ঞানীরা তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় সরকারের একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী সাহসী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন।
নির্বাচনি ইশতেহারকে কেবল কাগজের দলিল না রেখে ভোটের কালি শুকানোর আগেই তার বাস্তবায়ন শুরু করাকে এই সরকারের অন্যতম সেরা সাফল্য হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ১২ লাখ ক্ষুদ্র কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ, ইমাম-মোয়াজ্জিনদের ভাতা এবং পথশিশুদের স্থায়ী পুনর্বাসনে ৪২০ কোটি টাকার প্রকল্প সরাসরি প্রান্তিক মানুষকে স্পর্শ করেছে। বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন ও যুবসমাজকে কেন্দ্র করে সরকারের গৃহিত পদক্ষেপগুলো প্রশংসিত হচ্ছে। অনার্স পর্যন্ত ছাত্রীদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ফ্রি করা, ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় আইডি কার্ড প্রদান এবং ৫০০ কোটি টাকার স্টার্ট-আপ তহবিল গঠন মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিত্তি মজবুত করছে। উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণ, ঘরে ঘরে হেলথ স্ক্রিনিং এবং নারীদের জন্য বিশেষায়িত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ গ্রামীণ ও শহরের সেবার মান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
বিগত সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির খোলস থেকে বের হয়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি গ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর এবং চীনের সাথে ৯.২১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের যৌথ উদ্যোগ দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করবে। পাসপোর্টে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ (ইসরায়েল ব্যতীত) ঘোষণাটি পুনরায় যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির গৌরবময় প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। জাতীয় সংসদে ‘ককাস অব আমেরিকা’ গঠন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া প্রমাণ করে যে, নতুন বাংলাদেশ ভূ-রাজনীতিতে আর কোনো আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র নয়, বরং সমতার ভিত্তিতে এক আত্মমর্যাদাশীল অংশীদার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত ৫ মাসে সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে খোদ প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাত্রা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। রাস্তায় সিগন্যালে প্রটোকলহীনভাবে গাড়ি থামানো, সরকারি অনুষ্ঠানে নিজের ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা এবং বিরোধী দলকে সংসদে ও সংসদের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়াÑ বাংলাদেশের ক্ষমতার ইতিহাসে এক বিরল ও নতুন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের জন্ম দিয়েছে। সেনাক্যাম্পে গিয়ে সাধারণ খাবার গ্রহণ বা বন্যাকবলিত এলাকায় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে উদ্ধারকাজে নামিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো তারেক রহমানকে ‘জনতার প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল আমিন বেপারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সার্বিকভাবে ৫ মাসের এই যাত্রায় বিএনপি সরকার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের একটি মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে পেরেছে। তবে সামনের দিনগুলোতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পুরোপুরি দূর করা, পাচারকৃত অর্থ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং বাজার সিন্ডিকেটকে স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিত্যপণ্যের দাম আরও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই হবে সরকারের মূল পরীক্ষা।
‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’Ñ প্রধানমন্ত্রীর এই স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আগামী দিনগুলোতেও সরকারকে এই অবারিত উদ্যম, দেশপ্রেম এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা অক্ষুণœ রাখাটাই এখন চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ৫ মাসের অর্জন আশাব্যঞ্জক, তবে দেশের মানুষ এখন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই রূপান্তরের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া আগামী মাসের মধ্যে ‘প্রবাসী কার্ড’-এর পরীক্ষামূলক প্রকল্পের কাজ চালু করবে সরকার। প্রথম পর্যায়ে প্রবাসী ডেবিট কার্ড চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন