দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান। একদিকে মূল্যস্ফীতি, কর বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক দমননীতির বিরুদ্ধে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে জনরোষ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকার সংকট বেলুচিস্তানে নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাষ্ট্রসংঘ উভয় অঞ্চলেই মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে ক্ষোভের বিস্তার :
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক সময়ে কর বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় যৌথ জনঅভিযান কমিটি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাকিস্তান প্রশাসন নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে। সংঘর্ষে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানির খবর প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চ কমিশনার ভলকার টুর্ক প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরায় চালুরও দাবি জানানো হয়।
বেলুচিস্তানের দীর্ঘ ইতিহাস :
বেলুচিস্তানের বর্তমান সংকটের শিকড় বহু পুরোনো। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর কালাত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়। সেই সময় থেকেই একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়, যা পরবর্তী কয়েক দশকে বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্রোহ ও সংঘাতের রূপ নেয়। বেলুচ জনগোষ্ঠীর প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন, প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য অধিকার এবং জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের স্বীকৃতি।
সম্পদে সমৃদ্ধ, উন্নয়নে পিছিয়ে :
আয়তনের দিক থেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও উন্নয়নের সূচকে বেলুচিস্তান পিছিয়ে রয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাস, স্বর্ণ, তামা ও গভীর সমুদ্রবন্দর থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় জনগণের বড় অংশ অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল বাইরের অঞ্চল ও বিনিয়োগকারীরা পেলেও সাধারণ বেলুচ জনগণের জীবনমানের তেমন উন্নতি হয়নি। অনেক জেলে ও কৃষক জীবিকা হারানোর অভিযোগও তুলেছেন।
মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ :
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সংস্থা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।
সশস্ত্র সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকট :
বেলুচিস্তানে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে হামলা চালিয়ে আসছে। সামরিক স্থাপনা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিভিন্ন অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ও বিদেশি প্রকৌশলীদের ওপর হামলার কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এসব ঘটনায় পাকিস্তান কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। তবে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথাও বিভিন্ন বিশ্লেষক তুলে ধরছেন।
স্বাধীনতার দাবি ও নতুন নেতৃত্ব :
সাম্প্রতিক সময়ে মীর ইয়ার বেলুচের স্বাধীনতার দাবিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন তিনি। তবে অতীতের বিভিন্ন আন্দোলনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, কেবল ঘোষণার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন সহজ হবে না।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, পাকিস্তানের সামরিক অবস্থান, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিলতা ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ :
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের অবস্থান দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে হওয়ায় অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের স্বার্থ এখানে জড়িয়ে আছে। ফলে বেলুচিস্তানের যেকোনো অস্থিরতা শুধু পাকিস্তান নয়, সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনে কোন পথে সমাধান :
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর ও বেলুচিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মানবাধিকার ইস্যু কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা কঠিন। রাষ্ট্রসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল নিরপেক্ষ তদন্ত, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি। অন্যথায় এই দুই অঞ্চলের অস্থিরতা ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন