বর্ষা মৌসুমের প্রবল বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক বন্যায় এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভয়াবহ দুর্যোগের মুখে পড়েছে। ভারত, চীন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কোথাও নদীর বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকেছে, কোথাও পাহাড়ধস ও মেঘভাঙা বৃষ্টিতে মুহূর্তেই জনপদ তলিয়ে গেছে। প্রাণহানি যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে এমন চরম আবহাওয়া এখন ক্রমেই ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আসামে ভয়াবহ পরিস্থিতি : ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক দিনের টানা ভারি বৃষ্টি এবং উজানের পাহাড়ি ঢলে রাজ্যের বহু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে।
রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একাধিক জেলায় বন্যাজনিত দুর্ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে প্রাণহানির সংখ্যা চল্লিশের বেশি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা সাত লাখ ছাড়িয়েছে। শিবসাগর, যোরহাট ও চরাইদেও জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। শত শত গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বহু সড়ক, সেতু ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজ্যজুড়ে অসংখ্য ত্রাণশিবির ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, অতীতে যেসব জেলায় এমন বন্যা দেখা যায়নি, এবার সেসব এলাকাও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সার্বক্ষণিক কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে মৃত্যুমিছিল : আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেও প্রবল বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পাহাড়ি ঢল, নদীর পানির আকস্মিক বৃদ্ধি এবং ভূমিধসে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অসংখ্য ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও সরকারি স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। দুই দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ব্যবধানে অন্তত ছেচল্লিশজনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অনেক মানুষ এখনো আটকা পড়ে আছেন। উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খোঁজ করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে কম ভূমিকা থাকলেও জলবায়ুর পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অভিঘাত বহন করছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো দেশ। বন্যা, খরা, হিমবাহ গলন এবং পানির সংকট মিলিয়ে এসব দেশের মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
চীনে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে : চীনের বিভিন্ন প্রদেশেও ভারি বর্ষণে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। বহু সড়ক, বসতবাড়ি ও কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে এবং জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিশে^র আরও কয়েক দেশে দুর্ভোগ : এশিয়ার বাইরে চিলিতেও প্রবল বর্ষণের পর ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। সেখানে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ঝড় ও বৃষ্টির কারণে লাখো মানুষ বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছেন। শত শত মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে মেক্সিকো, নাইজার ও সুদানেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এখন বিশ্বব্যাপী আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
সতর্কবার্তার ভাষা বদলের দাবি : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান আবহাওয়া সতর্কবার্তার শ্রেণিবিন্যাস সময়ের সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এখনো অপেক্ষাকৃত কম এবং অত্যন্ত বেশি বৃষ্টিপাতকে একই ধরনের সতর্কবার্তার আওতায় রাখা হচ্ছে। এতে প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা সাধারণ মানুষ এবং দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর কাছে স্পষ্ট হয় না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে দুই শতাধিক মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। অথচ বর্তমান ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সীমার বেশি সব বৃষ্টিকেই একই শ্রেণিতে রাখা হয়। ফলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণে বিলম্ব ঘটে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিবর্তিত জলবায়ুর বাস্তবতা বিবেচনায় এনে নতুন শ্রেণিবিন্যাস চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি রংভিত্তিক ঝুঁকি সতর্কবার্তা, উপজেলা পর্যায়ের পূর্বাভাস এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক বিশেষ সতর্কবার্তাও আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমন্বিত প্রস্তুতির ওপর জোর : বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া যথেষ্ট নয়; সেই তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশ যেভাবে সফলতা অর্জন করেছে, একই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা ভারি বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ক্ষেত্রেও গড়ে তুলতে হবে।
পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা, উন্নত গণনাভিত্তিক পূর্বাভাস প্রযুক্তি ব্যবহার, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু বিশ্লেষণ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা গেলে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
জলবায়ুর নতুন বাস্তবতা : এবারের বন্যা শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়, বরং পরিবর্তিত জলবায়ুর কঠিন বাস্তবতার স্পষ্ট ইঙ্গিত। একদিকে ভারি বর্ষণ, অন্যদিকে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও নদীর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে নতুন কওে হুমকির মুখে ফেলছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের চলমান অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিচ্ছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস, কার্যকর সমন্বয় এবং দ্রুত উদ্ধার ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। অন্যথায় ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়াবহ রূপে ফিওে আসবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন