তিনি চলে গেছেন আজ থেকে ঠিক ৪৬ বছর আগে, কিন্তু বাঙালির আবেগ, রোমান্স আর সিনেমার পর্দায় তার ম্যাজিক আজও সমান জীবন্ত। আজ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অবিসংবাদিত ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমারের প্রয়াণ দিবস। ১৯৮০ সালের এই দিনে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে শুটিং ফ্লোরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরবিদায় নেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। তার প্রয়াণ দিবসে দুই বাংলার চলচ্চিত্র অঙ্গন এবং কোটি কোটি ভক্ত তাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। চলচ্চিত্রে আসার আগে জীবিকার তাগিদে তাকে কলকাতার পোর্ট ট্রাস্টে ক্লার্কের চাকরিও করতে হয়েছিল।
রুপালি পর্দায় তার শুরুর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। প্রথম দিকের বেশ কয়েকটি সিনেমা ফ্লপ হওয়ায় তৎকালীন স্টুডিওপাড়ায় তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ফ্লপ মাস্টার’। তবে দমে যাননি তিনি। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে তার পায়ের তলার মাটি শক্ত হয়। এর পরের ইতিহাস শুধুই সাফল্যের। ‘দৃষ্টিদান’ থেকে শুরু করে ‘নায়ক’, ‘উত্তরায়ণ’, ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’ কিংবা ‘ঝিন্দের বন্দি’Ñপ্রতিটি সিনেমাতেই তিনি নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেন জুটিকে বলা হয় সর্বকালের সেরা রোমান্টিক জুটি। ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শাপমোচন’, ‘সবার উপরে’র মতো একের পর এক কালজয়ী সিনেমা উপহার দিয়ে এই জুটি বাঙালির রোমান্টিকতার সংজ্ঞা চিরতরে বদলে দেয়। সুচিত্রা সেন ছাড়াও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবী, মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তার অভিনয় দর্শকনন্দিত হয়েছিল। উত্তম কুমার শুধু একজন দুর্দান্ত অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি একাধারে প্রযোজক, পরিচালক ও প্লে-ব্যাক গায়কও ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের নির্দেশনায় ‘নায়ক’ এবং ‘চিড়িয়াখানা’ সিনেমায় তার অভিনয় আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়।
‘নায়ক’ সিনেমাতে তার অভিনীত ‘অরিন্দম মুখার্জী’ চরিত্রটি যেন ছিল তার নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা। ১৯৮০ সালের ২৩ জুলাই ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ সিনেমার শুটিং করার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৪ জুলাই রাতে বেলভিউ ক্লিনিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান শিল্পী। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা কলকাতা। আজ মহানায়কের প্রয়াণের ৪৬ বছর পরও বাংলা সিনেমা জগতে তার বিকল্প তৈরি হয়নি। নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের কাছে তিনি আজও অভিনয়ের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। বাঙালির পোশাকে, চলনে, আর ভালোবাসার অভিব্যক্তিতে উত্তম কুমার ছিলেন, আছেন এবং চিরকাল থাকবেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন