ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সর্বপ্রথম প্যানেল হিসেবে নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রদল। যেখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে শিক্ষা ও গবেষণা। এদিকে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের খবর নিয়ে তোলপাড় হওয়ার পর নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে সেনাবাহিনী। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ডাকসু বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে না, ভবিষ্যতেও এ ধরনের কোনো দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই।
বিজ্ঞপ্তিতে আইএসপিআর জানিয়েছে, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে জানানো হচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীকে এ ধরনের দায়িত্ব পালনের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে বলে সেনাবাহিনী বিশ্বাস করে।
এর আগে মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক গোলাম রব্বানী বলেন, ডাকসু নির্বাচনে তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে এবং তৃতীয় স্তরে সেনাবাহিনীকে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে রাখা হবে। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে ডাকসু নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছেন প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, নির্বাচনে নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই।
রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মারুফুল হক বলেন, শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেনা মোতায়েনের কথা বলা হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল, ভোটকেন্দ্রগুলো আবাসিক হল থেকে বের করে আনার, সেটি হয়েছে।
মারুফুল হক আরও বলেন, একজন শিক্ষার্থীর সবকটি ভোট দিতে আট মিনিট করে সময় লাগবে। শতভাগ ভোটার উপস্থিত থাকলেও যাতে সবাই ভোট দিতে পারেন, সে অনুপাতে ভোটকেন্দ্রে বুথ স্থাপন করা হবে। সবাই ভোট দিতে পারবেন। কোনো অনিয়ম হবে না। সবাই ভোট দিতে পারবেন। নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম আশঙ্কা এ মুহূর্তে নেই।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদল মনোনীত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান ইশতেহার ঘোষণা করেন। এ সময় জিএস প্রার্থী তানভীর বারী হামীম, এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদসহ প্যানেলের অন্যান্য প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনসহ কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।ইশতেহার শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা, কারিকুলাম, অবকাঠামো ও পরীক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ব্যাটারিচালিত শাটক সার্ভিস প্রচলন, হয়রানিমুক্ত প্রশাসনিক সেবা, শিক্ষাঋণ এবং ক্যাম্পাসভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের জন্য সাইবার সিকিউরিটি এবং বুলিং প্রতিরোধ, কার্যকর ডাকসু এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর কথা রয়েছে।
ছাত্রদলের ১০ দফা ইশতেহারের মধ্যে রয়েছে
শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে আধুনিক, আনন্দময়, বসবাসযোগ্য ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালে সময়টা যেন প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, শিক্ষণীয় এবং একই সাথে আনন্দময় সময় হিসেবে মনে রাখতে পারে, সেই লক্ষ্যে সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ। গেস্টকার-গণরুম সংস্কৃতি, জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দমন-নিপীড়নের মতো ঘৃণিত চর্চা বন্ধ করে ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব থেকে চিরকালের জন্য মুক্তকরণ। ভয়মুক্ত পরিবেশে ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করে সব ধর্ম, বর্ণ, মত ও পথের শিক্ষার্থীর সহাবস্থান ও অধিকার চর্চার সুযোগ নিশ্চিতকরণ। ক্লাসরুম সংকট নিরসনে সময়োপযোগী অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ও শ্রেণিকক্ষ বৃদ্ধির কার্যক্রম শুরু করা। শিক্ষার্থী নিপীড়ন, র্যাগিং, অনলাইন-অফলাইনে ঘৃণা ও মিস ইনফরমেশন প্রতিরোধে ডাকসুর অধীনে একটি স্বাধীন ‘শিক্ষার্থী সুরক্ষা সেল গঠন ও সশিক্ষার্থীদের যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ‘ইমার্জেন্সি হেল্পলাইন’ চালু। ক্যাম্পাসে মাদকসেবী ও ভবঘুরেসহ বহিরাগতদের অনধিকার প্রবেশ রোধ, পুরো ক্যাম্পাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও রাতের আলো জ্বালানো নিশ্চিত করা।
আবাসিক হলগুলোতে মশা ও ছারপোকামুক্ত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ: ক্যান্টিন ও ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের ওপর ভর্তুকি বৃদ্ধি, পুষ্টিবিদদের সমন্বয়ে টিম গঠন করে খাবারসমূহের স্বাস্থ্যগুণ ও পুষ্টিমান নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনার গুণগত উন্নতি। বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগীয় এলাকা, যেমন মোকাররম ভবন, কার্জন হল ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে নতুন ক্যান্টিন ও ক্যাফিটেরিয়া স্থাপন, যেন সব শিক্ষার্থী সহজেই সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর খাবার পেতে পারে।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস, নারী স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি: নারী শিক্ষার্থীদের পোশাকের স্বাধীনতা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। প্রতিটি আবাসিক হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তুকিতে স্যানিটারি প্যাড ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন, এবং হলের সব পরিচ্ছন্নতাকর্মী যেন নারী হয়, তা নিশ্চিতকরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে সার্বক্ষণিক নারী চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি নারী হলে স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট চালু। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলগুলোতে সান্ধ্য আইন বিলোপের মাধ্যমে রাতে প্রবেশের সময়সীমা বৃদ্ধি এবং এক হলের নারী শিক্ষার্থীদের অন্য নারী শিক্ষার্থী হলগুলোতে প্রবেশ ও সাক্ষাতের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থা দূর করা।
শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যবিমা নিশ্চিত করা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা গ্রহণ ও চলাচল সহজতর করা: বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানো তথা সার্বক্ষণিক ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স, ফার্মেসি সেবা নিশ্চিত করা এবং জরুরি ওষুধসমূহ বিনা মূল্যে প্রদানের ব্যবস্থা করা। সব আবাসিক হলে ২৪/৭ অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি ওষুধ ও ফার্স্ট এইড বক্সসহ মেডিকেল কর্নার স্থাপন করা। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীসহ অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের চলাচলের সুবিধার জন্য বিদ্যমান ভবনসমূহে র্যাম্প স্থাপন করা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রমে ব্রেইল এবং অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থাসমূহ নিশ্চিত করা।
কারিকুলাম, অবকাঠামো ও পরীক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং গবেষণার মানোন্নয়ন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স কারিকুলাম আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে কি নাÑ সেটি নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য ছাত্র, শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে কমিটি গঠন, যে কমিটির অন্যতম লক্ষ্য হবে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুযোগ সৃষ্টি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অফিসকে গতিশীল করা। গবেষণার মানোন্নয়ন গবেষণাগার আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ তৈরি, বিদেশে অবস্থানরত এলামনাইদের সম্পৃক্তকরণ এবং গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি। এমফিল ও পিএইচডি গবেষকদের জন্য আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা এবং অধিক হারে মাসিক ভাতা প্রদানের উদ্যোগ, যেন গবেষণাকে উৎসাহিত করা যায় এবং প্রশিক্ষণ ও প্রকাশনা সহায়তার সুযোগ হয়।
পরিবহন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, ব্যাটারিচালিত শাটল সার্ভিস প্রচলন এবং যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করা: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর পরিবেশবান্ধব ও ব্যাটারিচালিত পর্যাপ্ত পরিমাণ শাটল সার্ভিস চালু করা। সব রুটে আপ ট্রিপ দুপুর ১২টা পর্যন্ত ও ডাউনট্রিপ রাত ৯টা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সাথে সংযুক্ত শিক্ষার্থী বাস এবং বাস রুটের সংখ্যা ও পরিসর যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা। প্রতিটি বাসে বাধ্যতামূলকভাবে জিপিএস ট্র্যাকার স্থাপন করে একটি মোবাইল আপস চালু করা, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাসের লাইভ লোকেশন ও সময়সূচি জানতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রুটে যান চলাচল ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য সব যানবাহনের ফিটনেস নিয়মিতভাবে চেকিং করা। ক্যাম্পাসে যানজট কমাতে সাইকেল ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াতকে অগ্রাধিকার দেওয়া, নিরাপদ হাঁটার জন্য ফুটপাত ও অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলো সংস্কার করা।
হয়রানিমুক্ত প্রশাসনিক সেবা, শিক্ষা ঋণ এবং ক্যাম্পাসভিত্তিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা: রেজিস্ট্রার ভবনে ‘লাঞ্চের পরে আসেন’ কালচার দূর করে ভবনের সার্বিক কার্যক্রম হয়রানিমুক্ত, আধুনিক এবং গতিশীল করার লক্ষ্যে সার্টিফিকেট ও ট্রান্সক্রিপট উত্তোলন, নানাবিধ ফি প্রদানসহ যাবতীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ধাপে ধাপে ডিজিটালাইজড করা এবং ডিজিটাল সার্ভিস সমস্যার জন্য ডিজিটাল সাপোর্ট ডেস্ক তৈরি করা। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও এলামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য মেধাভিত্তিক বৃত্তি এবং সহজলভ্য শিক্ষাঋণ ব্যবস্থা চালু করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দোকান ও প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের ব্যাবসায়িক উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া। শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে স্টার্টআপ ক্যাপিটাল ও মেন্টরশিপ সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা এবং শেয়ার্ড ওয়ার্ক স্পেসের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন