মিয়ানমারের রাখাইনে সক্রিয় সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির দৌরাত্ম্যে আতঙ্কে রয়েছেন কক্সবাজারের টেকনাফের জেলেরা। নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে যেতে ভয় পাচ্ছেন তারা। গত এক সপ্তাহে চার দফায় ৬ ট্রলারসহ ৫১ জেলেকে নৌকাসহ ধরে নিয়ে গেছে এই সশস্ত্র গোষ্ঠী। এদের মধ্যে সাতজন রোহিঙ্গা জেলে রয়েছেন, যারা এখনো ফেরত আসেননি। এদিকে ৬ ট্রলারসহ ৫১ জেলেকে বাংলাদেশে ফেরত আনার চেষ্টা চলছেÑ জানিয়েছেন বিজিবি কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ।
উখিয়া ও টেকনাফের লক্ষাধিক পরিবারের প্রধান জীবিকা মাছ ধরা। কিন্তু আরাকান আর্মির দৌরাত্ম্যে এ পেশা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, পশ্চিমপাড়া, সাবরাং মু-ার ডেইল, বাহারছড়া, টেকনাফ সদরের তুলাতুলি ও খায়ুকখালী নৌঘাট ঘুরে দেখা গেছে, ভয়ে সাগরে নামানো হচ্ছে না ট্রলারগুলো। অলস বসে আছে শত শত নৌযান।
শাহপরীর দ্বীপ ছোট নৌকাঘাটের সভাপতি আব্দুল গফুর বলেন, ‘সাগরে গেলেই জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে আরাকান আর্মি। এভাবে চলতে থাকলে জেলেরা বাধ্য হয়ে পেশা বদল করবে। বিজিবি ও কোস্ট গার্ডকে জানিয়েও কার্যকর সমাধান মিলছে না।’
তিনি আরও জানান, দীর্ঘ ৯ মাস ধরে আরাকান আর্মির আনাগোনা রয়েছে নাফ নদী ও সাগরে। টহল থাকলেও পর্যাপ্ত দ্রুতগামী নৌযান ও জনবল না থাকায় সীমান্ত সুরক্ষায় ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
মিয়ানমারের কারাগার থেকে ফেরত আসা জেলে হামিদ বলী বলেন, ‘নাফ নদী খোলার পর ভেবেছিলাম আগের মতো মাছ শিকার করতে পারব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নদী বন্ধ থাকাই ভালো ছিল। সরকারের উচিত ছিল নদী খোলার সঙ্গে সঙ্গেই জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’
সাবরাং মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন মুন্ডার ডেইল নৌঘাটের সভাপতি শহিদুল্লাহ জানান, ‘৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে অনেক আশায় বুক বেঁধেছিল জেলেরা। কিন্তু মাছ শিকারে গিয়ে বারবার আরাকান আর্মির হাতে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।’
টেকনাফ কায়ুকখালীয়া ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি সাজেদ আহমদ বলেন, ‘কোনো কারণ ছাড়াই বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে জেলেদের বাধা দিচ্ছে আরাকান আর্মি। ট্রলারে লুটপাটও করছে। এ অবস্থায় টেকনাফের চার শতাধিক ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না।’
বিজিবি টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ইতিমধ্যে অনেক জটিলতা সমাধান হয়েছে। গত ডিসেম্বর থেকে বিজিবির প্রচেষ্টায় ১৮৯ জন জেলে এবং ২৭টি নৌযান ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। নতুন করে যাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, ‘জেলেদের অপহরণ ও নৌযান আটকানোর বিষয়টি আমরা জানি। কোস্ট গার্ডকে সতর্ক রাখা হয়েছে। তবে জেলেদেরও জলসীমা অতিক্রম অতিক্রম করা যাবে না।’
জেলেদের ফেরত আনার চেষ্টা চলছে: বিজিবি কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, নাফ নদী থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া ৬ ট্রলারসহ ৫১ জেলেকে বাংলাদেশে ফেরত আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন বিজিবি কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় সেক্টর হেডকোয়ার্টার্স রামুতে আয়োজিত সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, নাফ নদীতে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের টহল তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাই নাফ নদীতে আরাকান আর্মি কেন, আরাকানের কোনো সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনের ঢোকার কোনো সুযোগ নেই, নাফ নদীতে বাংলাদেশ অংশে ঢুকে তারা জেলেদের ধরে নিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ১৭৪ কিলোমিটার সীমান্ত মিয়ানমারের সাথে রয়েছে। মিয়ানমারে জাতিগত সংঘাত চলছে। সে কারণে বাংলাদেশ সীমান্তেও চলছে অস্থিরতা, সেই অস্থিরতাকে সাথে নিয়েই প্রযুক্তিগত, অবকাঠামোগত ও জনবলসহ নানা সংকটের মাঝেও আমরা সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, সীমান্তে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমরা হামলার শিকার হই। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।
নাফ নদীতে মাছ শিকার করতে গিয়ে অপহরণের শিকারের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় মাছ শিকারকে পুঁজি করে জেলেরা মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ে। তাদেরও দমনে বিজিবি বদ্ধপরিকর।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন