শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


এফ এ শাহেদ

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৫, ১০:১৩ এএম

তিন কারণে পদত্যাগ  এনসিপি নেতাদের

এফ এ শাহেদ

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৫, ১০:১৩ এএম

এনসিপি

এনসিপি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে আলোচিত নতুন দলটি ঘিরে গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ঊর্ধ্বমুখী। দেশ গঠনে নয়া বন্দোবস্তের ঘোষণা দিয়ে আলোড়নও সৃষ্টি করে দলটি। তবে দলটির কিছু নেতাকর্মীর কর্মকা-ে দেশজুড়ে সমালোচনাও উঠেছে। এ ছাড়া অভন্তরীণ কোন্দল, জবাবদিহির ঘাটতি, অনিয়ম-চাঁদাবাজির অভিযোগ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণ দেখিয়ে গত দেড় মাসে পদত্যাগ করেছেন এনসিপির প্রায় ৪০ নেতাকর্মী। যারা পদত্যাগ করেছেন, তাদের অভিযোগÑ যে প্রত্যাশা নিয়ে এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তা পূরণ হচ্ছে না বরং দলীয় নানা কর্মকা-ে বিব্রত এবং হতাশা থেকেই তারা দল ত্যাগ করেছেন। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়া, একই সঙ্গে পদত্যাগ করা প্রত্যেকের অধিকার। তবে, যে অভিযোগ তুলে তারা পদত্যাগ করছেন, সে বিষয়ে এনসিপির ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। 

চলতি বছরের এপ্রিলে এনসিপির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং দলের যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীরের বিরুদ্ধে তদবির বাণিজ্যের অভিযোগে তাকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর থেকেই দলের মধ্যেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। চলতি মাসেই আর্থিক কেলেঙ্কারি ও গুরুতর দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী নিজাম উদ্দিনকে বহিষ্কার করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আন্দোলন বন্ধ করতে ৫ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে নিজামের বিরুদ্ধে। নানা ঘটনায় এনসিপিসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ থেকে বহিষ্কার করা হলেও জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির নানা অভিযোগ আলোচনায় জন্ম দেয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনে সক্রিয় থাকা অনেকের বিরুদ্ধেই গত বছরের আগস্টের পর থেকেই ক্ষমতা প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়, সচিবালয়ে তদবিরসহ নানা অভিযোগ আসছিল। ফলে দলীয় কর্মকা-ে হতাশা, অনিয়মের অভিযোগ, না জানিয়ে পদায়ন বা অন্য দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণ দেখিয়ে গত ৪৫ দিনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে প্রায় ৪০ নেতাকর্মী পদত্যাগ করেছেন।

এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যে কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার যেমন সুযোগ আছে, বের হওয়ারও সুযোগ আছে। যেসব নেতাকর্মী দল থেকে বের হয়ে নানা ধরনের অভিযোগ করছেন, তারা সেগুলো করতেই পারেন। এগুলো খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়। তবে এনসিপির বিষয়ে সাবেক নেতাকর্মীরা যে অভিযোগ তুলছেন, তার সত্যতা কতটুকু, দল হিসেবে আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অভিযোগগুলো যদি অসত্য হয়ে থাকে, সে বিষয়ে যথাযথ দলীয় ব্যবস্থা এবং যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলেও দলীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। 

এনসিপি থেকে যেসব নেতাকর্মী পদত্যাগ করেছেন, তাদের মধ্যে গত ২৬ আগস্ট ময়মনসিংহের নান্দাইলে এনসিপির উপজেলা কমিটি থেকে একযোগে চারজন নেতা পদত্যাগ করেন। দলের নীতি, আদর্শ ও নৈতিকতার অভাবকে কারণ দেখিয়ে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন। এর আগে গত ২১ আগস্ট শেরপুরের নকলায় এনসিপির উপজেলা সমন্বয় কমিটি থেকে একযোগে ১৫ সদস্য পদত্যাগ করেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে পাঁচজন যুগ্ম সমন্বয়ক ও ১০ জন সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া গত ১০ আগস্ট ফরিদপুরের সমন্বয় কমিটির সদস্য রুবেল মিয়া (হৃদয়) পদত্যাগ করেন। এনসিপির ফরিদপুর জেলা সমন্বয় কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী সৈয়দা নীলিমা দোলার কাছে দেওয়া পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেনÑ দলের কর্মকা-, বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ, দলের সিদ্ধান্ত জুলাই বিপ্লবের নীতি ও নৈতিকতার পরিপন্থি বলে মনে হওয়ায় আমি গভীরভাবে হতাশ। গত ৯ আগস্ট মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা সমন্বয় কমিটি থেকে একসঙ্গে পদত্যাগ করেন এনসিপির চার নেতা। তারা হলেনÑ উপজেলার যুগ্ম সমন্বয়কারী শাকিল খান এবং সমন্বয় কমিটির সদস্য রিয়াজ রহমান, মহিউদ্দিন ও কাজী রফিক। পদত্যাগ করার কারণ হিসেবে তারা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শিবচর থানায় দল পরিচালনার দায়িত্ব কিছু অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে, যারা আদর্শিক, নৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে সম্পূর্ণ অযোগ্য। 

এর আগে ৮ আগস্ট চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার জাতীয় নাগরিক পার্টির সমন্বয় কমিটি থেকে ১ নম্বর যুগ্ম সমন্বয়কারী এ ইউ মাসুদ (আরফান উদ্দিন) পদত্যাগ করেন। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তিনি এ সিদ্ধান্ত জানান। পদত্যাগের বিষয়ে এ ইউ মাসুদ বলেন, ‘কমিটি দেওয়ার আগে জানানো হয়েছিল আমি প্রধান সমন্বয়কারীর পদ পাব। কিন্তু কমিটি প্রকাশ হওয়ার পর দেখলাম, যুগ্ম সমন্বয়কারীর পদ দেওয়া হয়েছে। এখানে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন কিংবা সম্পর্ক অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। একই দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে দুই নেতা শরীয়তপুর জেলা সমন্বয় কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী ও ডামুড্যা উপজেলা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী তারিকুল ইসলাম এবং জেলা কমিটির সদস্য পলাশ খান পদত্যাগ করেন। তারা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের কথা জানান। 

এর আগে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা এনসিপির কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন ইসমাইল হোসাইন ও ইঞ্জিনিয়ার আলাউদ্দিন নামে দুই নেতাও, যারা নিজেদের জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পরিবারের লোক বলে উল্লেখ করেন। পদত্যাগের বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমি জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পরিবারের লোক। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতি করায় মামলা-হামলার শিকার হয়েছি। এনসিপির উপজেলা কমিটিতে আমাকে রাখার বিষয়ে পূর্বে অবগত করা হয়নি, এমনকি আমি তাদের কোনো কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করিনি। তাই আমি পদত্যাগ করেছি।’ 

গত ২৯ জুন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন স্বাক্ষরিত মতলব দক্ষিণ উপজেলা শাখার সমন্বয় কমিটি ঘোষিত হয়। এর কিছুক্ষণ পরই ওই কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ডি এম আলাউদ্দিনকে ‘জাতীয় পার্টির নেতা ও ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ করেন যুগ্ম সমন্বয়কারী হেলাল উদ্দিন। নিজের ফেসবুক আইডি থেকে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এ ছাড়া ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এবং কেন্দ্রীয় দপ্তরে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে এনসিপি বাগমারা উপজেলা কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন তিন সদস্যÑ হাদিউজ্জামান রাফি, ফুয়াদ হাসান গানিম ও রাবিউল ইসলাম রাহুল।

দলীয় নেতাকর্মীদের পদত্যাগের পাশাপাশি কমিটি স্থগিতের ঘটনাও ঘটেছে দলটিতে। দল থেকে পদত্যাগ করা একাধিক নেতা নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিভিন্ন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নানা সুবিধার বিনিময়ে কমিটিতে প্রবেশ করানোর জন্য দায়ী কেন্দ্রীয় নেতাদের একাংশ।   

এনসিপি সূত্রে জানা যায়, দলীয় নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে গত ১ জুন ঢাকা মহানগর উত্তরে সমন্বয় কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এনসিপির কমিটি গঠন শুরু হয়। এখন পর্যন্ত দেশের ৩৩টি জেলা এবং প্রায় ২০০ উপজেলায় সমন্বয় কমিটি করে এনসিপি। এসব কমিটি গঠনের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরিবারের সদস্যকে পদায়ন, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে অনিয়মসহ নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। পরে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে এবং সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগ করেন অনেক নেতা। শুধু সিলেট জেলা থেকেই পদত্যাগ করেন ৯ জন। বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় দুটি শাখা কমিটি স্থগিতও করা হয়। এর আগে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের পরপর পদত্যাগ করেছিলেন তিন নেতা। এনসিপি নেতারা বলছেন, দ্রুত কমিটি ঘোষণা করায় এমন ঘটনা ঘটছে। কমিটি গঠনের সময় তেমন যাচাই-বাছাই করা হয়নি। তবে কারো কারো দাবি, এনসিপিকে বিতর্কিত করার জন্যই বিএনপি ও জামায়াতের কেউ কেউ দলটিতে যুক্ত হয়ে আবার পদত্যাগ করেছেন।

এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিভিন্ন কমিটি থেকে কারা পদত্যাগ করছেন, কেন করছেন বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। যেসব অভিযোগ সামনে আসছে, সেগুলো আমাদের শৃঙ্খলা কমিটি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এর ধারাবাহিকতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা মধ্যম পন্থার রাজনীতি মেনে নিতে পারছেন না বা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছেন না, তারা সরে যাচ্ছেন। এটি বড় কোনো ইস্যু না। আমরা মধ্যম পন্থার রাজনীতির দর্শন ধরে রাখাতে চাইছি।’ 

এ বিষয়ে এনসিপির উপজেলা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী আলী মর্তুজা বলেন, অনেকে পারিবারিক বা সামাজিক চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন। স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে সেটি তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি তার প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। তবে, অনেকে দলের সুনাম নষ্টের উদ্দেশ্যে পদত্যাগ করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এমন ঘটনা ঘটানো হতে পারে। মূলত এনসিপিকে বিতর্কিত ও সুনাম ক্ষুণœ করার জন্যই তারা কমিটিতে থেকেছেন এবং পদত্যাগ করেছেন। পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করার মাধ্যমে দায়িত্বশীল পদ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!