মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের কালো ধোঁয়া যত ঘন হচ্ছে, ততই কেঁপে উঠছে বিশ^ জ্বালানি বাজার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ লাফিয়ে বেড়েছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে তেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় বিশ^ অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক লেনদেনে দেখা গেছে, বিশে^র অন্যতম প্রধান মানদ-ের দুটি অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। একটি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৭ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্য মানদ-ের তেলের দামও বেড়ে প্রায় ১১৭ দশমিক ৭০ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারেÑ এই আশঙ্কাই বাজারে দামের এমন উল্লম্ফনের মূল কারণ।
হরমুজ প্রণালিতে সংকট :
বিশ^ জ্বালানি বাজারে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালি ঘিরে। বিশে^র মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু সংঘাতের পর সেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দেওয়ায় বহু তেলবাহী জাহাজ আটকে গেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রণালির দুই প্রান্তে শত শত জাহাজ অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে বিশ^বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে বিশ^জুড়ে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তেল স্থাপনায় হামলা, উত্তেজনা বৃদ্ধি :
যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তেল অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েল ইরানের তেল সংরক্ষণাগার ও জ্বালানি স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান অঞ্চলজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাইবাহ তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করে ইরানের ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে। তবে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ড্রোনগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এদিকে বাহরাইনের একটি বড় তেল শোধনাগারেও হামলার পর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
গ্যাস বাজারেও চাপ :
শুধু তেল নয়, প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। ইরানের ড্রোন হামলার পর বিশে^র অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি তাদের একটি বড় স্থাপনায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে।
বিশে^র মোট তরলীকৃত গ্যাস রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কাতার থেকে আসে। ফলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে এশিয়ার দেশগুলোতে। কারণ এই অঞ্চলের দেশগুলো জ্বালানি আমদানির জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
বিশ্ব শেয়ারবাজারে ধস :
তেলের দামের এই উল্লম্ফনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ^ শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বাজারে সূচকের বড় পতন হয়েছে। জাপানের প্রধান সূচক লেনদেনের শুরুতেই সাত শতাংশের বেশি কমে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারেও আট শতাংশের বেশি পতন হয়। হংকংয়ের বাজারেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে বিশ^ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারেÑ এই আশঙ্কাতেই বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
মূল্যস্ফীতির নতুন আশঙ্কা :
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করে জানিয়েছে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে বিশ^জুড়ে মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তে পারে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম যদি ১০ শতাংশ বাড়ে এবং তা দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়, তা হলে বৈশি^ক মূল্যস্ফীতি প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়ে।
সম্ভাব্য কূটনৈতিক পদক্ষেপ :
বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো বিকল্প পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। জি-৭ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা জরুরি মজুত থেকে তেল বাজারে ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন। এই পদক্ষেপ নেওয়া হলে বাজারে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে এবং দাম স্থিতিশীল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ বন্ধ না হলে এই ধরনের পদক্ষেপের প্রভাব সীমিতই থাকবে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে :
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব জ্বালানি বাজার অত্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধ যদি দ্রুত শেষ না হয়, তা হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। কিছু বিশ্লেষকের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তা ২০০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে। এই অবস্থায় বিশ^ অর্থনীতি আবারও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি এখন বিশ^ অর্থনীতির জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তেল ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকলে বৈশি^ক অর্থনীতি নতুন করে অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে না পেলে জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা আরও দীর্ঘ সময় স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব জ্বালানি বাজার অত্যন্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। সংঘাত যদি দ্রুত শেষ না হয়, তা হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আরও খারাপ পরিস্থিতিতে তা ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমন হলে বিশ^ অর্থনীতি আবারও বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। জ্বালানির খরচ বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পরিবহন খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির বিষয় নয়, এটি বিশ^ অর্থনীতির জন্যও বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তেল ও গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা যত বাড়ছে, ততই অস্থির হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক বাজার। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না হলে এই অস্থিরতা আরও দীর্ঘ সময় স্থায়ী হতে পারে। আর তার প্রভাব পড়বে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন