গাজার ধ্বংসস্তূপে যখন ভাষা থেমে যায়, তখন কথা বলতে শুরু করে সুঁই-সুতা। বোমার শব্দ, ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি, শরণার্থীর দীর্ঘশ্বাস আর হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোর স্মৃতি ধরে রাখতে ফিলিস্তিনি নারীরা বুনে চলেছেন এক ব্যতিক্রমী ইতিহাস। তাদের প্রতিটি সেলাই যেন একটি নামহীন মৃত্যুর সাক্ষ্য, প্রতিটি নকশা যেন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মানুষের গল্প। এই শিল্পকর্মের নাম ‘গাজা গণহত্যা ট্যাপেস্ট্রি’। বিশাল এই সূচিকর্মে উঠে এসেছে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা, মৃত্যু এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আগামী মে মাস থেকে ইতালির ভেনিসে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমঞ্চ ভেনিস বিয়েনালেতে এটি প্রদর্শিত হবে। ফিলিস্তিন, লেবানন ও জর্ডানের শরণার্থী শিবিরে থাকা ফিলিস্তিনি নারীরা মিলে এটি তৈরি করেছেন। মোট ১০০ সূচিকর্মের প্যানেলে গাজার ধ্বংসযজ্ঞ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি প্যানেলে রয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার সেলাই। সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে গাজার এক জীবন্ত দলিল। এই প্রকল্পের সহ-কিউরেটর ফিলিস্তিনি সাংবাদিক জেহান আলফারা বলেন, একজন সাংবাদিক হিসেবে শব্দই ছিল তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিন্তু গাজার চলমান হত্যাযজ্ঞের সামনে ভাষা অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে। তার স্মৃতিতে এখনো ভেসে ওঠে যুদ্ধের শুরুর দিকের এক দৃশ্য। একটি বুলডোজার উজ্জ্বল নীল ব্যাগে মোড়ানো ১১১টি মরদেহ গণকবরে দাফন করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মুহূর্ত দেখা যাওয়া সেই দৃশ্য পরে হারিয়ে যায় আরও ভয়াবহ অসংখ্য ছবির ভিড়ে। তিনি বলেন, ‘ওই মানুষগুলোর কারও নাম জানা যায়নি। জানা যায়নি তাদের স্বপ্ন, তাদের শেষ মুহূর্তের কথা। সংবাদ শিরোনামে শুধু সংখ্যা ছিল, কিন্তু সেই ভয়াবহতা ভাষায় ধরা যায়নি।’ এই সীমাবদ্ধতা থেকেই জন্ম নেয় ‘গাজা গণহত্যা ট্যাপেস্ট্রি’। শব্দ যেখানে থেমে যায়, সেখানে সুঁই-সুতাই হয়ে ওঠে সাক্ষ্য।
প্রতিটি সেলাই একেকটি স্মৃতি : ট্যাপেস্ট্রির প্রতিটি প্যানেলে রয়েছে আলাদা গল্প। কোথাও এক বাবা সন্তানের মরদেহ বুকে জড়িয়ে কাঁদছেন। কোথাও খাবারের লাইনে দাঁড়ানো শিশুদের ভিড়। কোথাও ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসে থাকা এক আহত শিশুর বিলাপ। কিছু দৃশ্য বিশ্ববাসীকে সাময়িকভাবে নাড়া দিয়েছিল। যেমনÑ খালিদ নাবহান নামের এক বৃদ্ধ তার নিহত নাতনিকে ‘আমার প্রাণের প্রাণ’ বলে শেষবারের মতো বুকে টেনে নিচ্ছেন। আবার কোথাও দেখা যায় চিকিৎসক হুসাম আবু সাফিয়াকে, যিনি ইসরায়েলি ট্যাংকের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন সেনাদের নির্দেশে। এরপর আর তাকে দেখা যায়নি।
কিন্তু গাজার অধিকাংশ ছবিই হারিয়ে গেছে কোনো নাম বা বিদায় ছাড়া। সেই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো ধরে রাখার চেষ্টাই এই ট্যাপেস্ট্রি। জেহান আলফারা বলেন, ‘এটি শুধু শিল্প নয়, এটি আমাদের স্মৃতির সংগ্রহশালা। পৃথিবীকে মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টাÑ কী ঘটেছিল, কার সঙ্গে ঘটেছিল।’
তাতরিজ থেকে প্রতিরোধের শিল্প : এই প্রকল্প মূলত পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘ফিলিস্তিন ইতিহাস ট্যাপেস্ট্রি প্রকল্প’-এর নতুন অধ্যায়। গাজায় জন্ম নেওয়া নকশাকার ইব্রাহিম মুহতাদির সঙ্গে জেহান আলফারা এটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিখ্যাত ‘বায়ো ট্যাপেস্ট্রি’ ও ‘স্কটল্যান্ডের মহা ট্যাপেস্ট্রি’র আদলে এটি তৈরি হয়েছে। তবে এটি শুধু ইতিহাস নয়, একই সঙ্গে বর্তমানের রক্তক্ষরণের দলিলও। প্রকল্পটির সূচনা হয়েছিল ২০১১ সালে। ব্রিটিশ নার্স জান চালমার্স, যিনি ষাটের দশকে গাজায় কাজ করেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের ঐতিহ্যবাহী সূচিকর্মশিল্প ‘তাতরিজ’ দেখে অনুপ্রাণিত হন। তার মনে হয়েছিল, ফিলিস্তিনেরও নিজস্ব ইতিহাস ট্যাপেস্ট্রি থাকা উচিত। ফিলিস্তিনের শতাব্দীপ্রাচীন এই সূচিকর্মশিল্প বহুদিন ধরে তাদের পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতীক। ২০২১ সালে এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়। নাকবার পর এটি হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার মাধ্যম। আর এখন তা পরিণত হয়েছে যুদ্ধের সাক্ষ্যে।
শরণার্থী নারীদের হাতেই ইতিহাস : শুরুতে গাজার নারীরাই এই প্রকল্পে সবচেয়ে সক্রিয় ছিলেন। তাদের সূচিকর্ম ছিল নিখুঁত ও জীবন্ত। কিন্তু যুদ্ধ তীব্র হওয়ার পর অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেউ বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে হারিয়ে গেছেন। গাজায় কাঁচামাল পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তৈরি কাজও বাইরে পাঠানো যায়নি। ফলে যারা একসময় গল্প সেলাই করছিলেন, তারাই পরে হয়ে ওঠেন গল্পের চরিত্র। তবু কাজ থেমে থাকেনি। লেবাননের আইন আল-হিলওয়ে শরণার্থী শিবিরের ইমান শেহাবি, বাসমা নাতুরসহ অনেক নারী এই প্রকল্পে যুক্ত হন। তারা জানান, সূচিকর্ম তাদের জীবিকার উৎস হলেও এই কাজ তাদের সম্মান ও পরিচয়ের অনুভূতি ফিরিয়ে দিয়েছে। এক চিঠিতে তারা লিখেছেন, ‘আমাদের সুঁই একসঙ্গে সেলাই করেছে আশা আর বেদনার গল্প।’ শুধু সূচিকর্মশিল্পীরাই নন, বিভিন্ন শিল্পীও এতে যুক্ত হয়েছেন। কারও আঁকা ছবি পরে অন্য কেউ সূচিকর্মে রূপ দিয়েছেন। ফলে এটি হয়ে উঠেছে সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে থাকা ফিলিস্তিনি জনগণের সম্মিলিত স্মৃতি।
নাকবা থেকে আজকের গাজা : ফিলিস্তিনিদের কাছে ‘নাকবা’ শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, এটি চলমান বাস্তবতা। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ৭ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হন। শত শত গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। সেই বাস্তুচ্যুতির স্মৃতি আজও ফিলিস্তিনি জীবনের কেন্দ্রে। বহু মানুষ এখনো শরণার্থী শিবিরে বাস করছেন। তাদের স্বপ্ন এখনো নিজেদের ভূমিতে ফিরে যাওয়া। এরপর বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ, দখল, অবরোধ ও বসতি সম্প্রসারণ ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আরও জটিল করেছে। গাজা ২০০৭ সাল থেকে অবরোধের মধ্যে রয়েছে। খাদ্য, ওষুধ, জ¦ালানি, চিকিৎসা সরঞ্জামÑ সবকিছুর প্রবেশ সীমিত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া নতুন যুদ্ধকে অনেকেই ‘নতুন নাকবা’ হিসেবে দেখছেন। কারণ এবারও লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, ধ্বংস হয়েছে হাসপাতাল, স্কুল ও বাড়িঘর। পুরো পরিবার একসঙ্গে হারিয়ে গেছে। হাজার হাজার শিশু অনাথ হয়েছে। খাদ্য ও পানির সংকট ভয়াবহ আকার নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৪৮ সালের নাকবা আর বর্তমান গাজা যুদ্ধের মধ্যে ভয়াবহ মিল রয়েছেÑ উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে বাস্তুচ্যুতি, ভূমি হারানো ও অস্তিত্বের সংকট।
যুদ্ধবিরতির মাঝেও রক্তপাত : যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার দাবি করা হলেও গাজায় সহিংসতা থামেনি। ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর অভিযোগ, বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ, গুলিবর্ষণ ও ত্রাণে বাধা দিয়ে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল। তাদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাসেই হাজারের বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছে। এদিকে ইসরায়েল বলছে, এসব অভিযান তারা নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিচালনা করেছে এবং হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ক্ষতিগ্রস্তদের বড় অংশই সাধারণ বেসামরিক মানুষ। ত্রাণ প্রবেশেও রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে তার অনেক কম প্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে গাজায় আবারও দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভেনিসে উঠবে গাজার সাক্ষ্য : আগামী মে মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভেনিসের পালাজ্জো মোড়ায় প্রদর্শিত হবে এই ট্যাপেস্ট্রি। প্রদর্শনীর শিরোনামÑ ‘গাজা : কোনো শব্দ নেই, দেখুন প্রদর্শনী’।
জেহান আলফারা বলেন, বিশ্বের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক মঞ্চে এই কাজ প্রদর্শিত হওয়া একদিকে গৌরবের, অন্যদিকে গভীর বেদনারও। কারণ, বিশ্ব ক্রমেই গাজার ঘটনাকে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে স্বীকার করছে, কিন্তু তা থামাতে পারছে না। তিনি বলেন, ‘যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়, তখন শিল্পই হয়ে ওঠে সাক্ষ্য।’ এই ট্যাপেস্ট্রি সেই সাক্ষ্যই বহন করছে। এটি শুধু ধ্বংসের গল্প নয়, বরং টিকে থাকার গল্পও। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও ফিলিস্তিনি নারীরা এখনো গল্প বলে চলেছেন। তারা এখনো জবাবদিহি দাবি করছেন। তাদের প্রতিটি সেলাই যেন ঘোষণা করছেÑ স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে না। প্রয়াত ফিলিস্তিনি শিক্ষক রিফাত আলারির বিখ্যাত কথার মতোইÑ যদি কেউ মারা যায়, তবু তার গল্প বেঁচে থাকবে অন্য কারও কণ্ঠে।
আর আজ সেই গল্পই বলা হচ্ছে সুঁই-সুতার ভাষায়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন