মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুথিডং এলাকার হইয়ার সিরি গ্রাম। একসময় যেখানে সবুজ ধানখেত, গবাদিপশু আর মানুষের কোলাহলে ভরা ছিল জনপদটি, আজ সেখানে ছড়িয়ে আছে পোড়ামাটির গন্ধ, মানুষের কঙ্কাল আর ধ্বংসস্তূপ। ২০২৪ সালের ২ মে সংঘটিত ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের দুই বছর পার হলেও এখনো বিচার পায়নি বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গারা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই বিভীষিকার বিস্তারিত চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন জাতিগত রাখাইন সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি হইয়ার সিরি গ্রামে অন্তত ১৭০ জন রোহিঙ্গা পুরুষ, নারী ও শিশুকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৯০ জনই শিশু। স্থানীয়দের ধারণা, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক হতে পারে।
‘চারপাশে শুধু কঙ্কাল আর খুলি’ : গ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের একজন ওমর আহমদ। জীবন বাঁচাতে তিনি পরে বাংলাদেশে এসে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। হত্যাকা-ের কয়েক মাস পর তিনি গোপনে নিজের গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন কিছু জিনিসপত্র আনতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেন, তা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তার ভাষায়, পুরো গ্রাম ছিল জনশূন্য। কোনো গরু, ছাগল বা হাঁস-মুরগি ছিল না। পরে তিনি সেই ধানখেতের দিকে যান, যেখানে তার আত্মীয়স্বজনসহ বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। সেখানে ছড়িয়ে ছিল মানুষের কঙ্কাল আর খুলি। অনেক মরদেহের কাপড় তখনো অক্ষত ছিল, যদিও শরীরের মাংস পচে গিয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তদন্তকারীরা বেঁচে যাওয়া মানুষের সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট ছবি, ভিডিও ও আলোকচিত্র বিশ্লেষণ করে এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করেছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নিহতদের খুলিতে গুলির চিহ্নও শনাক্ত করেছেন।
সংঘাতের কেন্দ্রে একটি গ্রাম : হইয়ার সিরি গ্রামটির অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুথিডং-রাথিডং সড়কের পাশে অবস্থিত এই গ্রামটির এক পাশে ছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক ঘাঁটি, অন্য পাশে আরেকটি ব্যাটালিয়ন। দীর্ঘদিন ধরে এটি তুলনামূলক নিরাপদ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৭ সালের ভয়াবহ রোহিঙ্গা নিধনের সময়ও গ্রামটি বড় ধরনের হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
তাই ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে আশপাশের বহু বাস্তুচ্যুত মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নেয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই নিরাপদ আশ্রয়টি পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। সেনাবাহিনী তখন গ্রামবাসীদের ওপর জোরপূর্বক লোক সরবরাহের চাপ সৃষ্টি করছিল। অভিযোগ রয়েছে, গ্রামবাসীদের বলা হয়েছিলÑ যদি তারা যুবকদের সেনাবাহিনীতে না দেয়, তাহলে পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হবে। বাধ্য হয়ে কয়েকজন তরুণকে পাঠানো হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আরাকান আর্মি গ্রামবাসীদের জান্তা-সমর্থক হিসেবে সন্দেহ করতে শুরু করে। একদিকে সেনাবাহিনীর চাপ, অন্যদিকে আরাকান আর্মির হুমকিÑ দুই আগুনের মধ্যে পড়ে যায় সাধারণ মানুষ।
সাদা পতাকা নিয়েও রক্ষা হয়নি : ২০২৪ সালের ২ মে ভোরে আরাকান আর্মি সেনাবাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি দখল করে নেয়। এরপর আশঙ্কায় হাজার হাজার গ্রামবাসী বুথিডং শহরের দিকে পালাতে শুরু করেন। অনেকের হাতেই ছিল সাদা পতাকা, যাতে বোঝানো যায় তারা নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ। কিন্তু পথেই শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তৈনল্লা মুরা নামের একটি এলাকায় পৌঁছানোর পর হঠাৎ চারদিক থেকে গুলি শুরু হয়। কোনো সতর্কতা ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করা হয়। এক ব্যক্তি জানান, তার ছেলেকে প্রথমে গুলি করা হয়। এরপর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে তার স্ত্রী কাঁপা হাতে কিছু টাকা দিয়ে তাকে পালিয়ে যেতে বলেছিলেন। আরেক নারী বলেন, মানুষজন মসজিদের পাশে ধানখেতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে তাদের জড়ো করে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করা হয়। এরপর একে একে গুলি চালানো হয়। তিনি নিজেও চারবার গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। পরে মৃত মানুষের স্তূপের নিচে লুকিয়ে বেঁচে যান।
ধানখেত হয়ে ওঠে বধ্যভূমি : হামলার পর পুরো এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। ধানখেত, রাস্তা, মসজিদের পাশÑ সব জায়গায় পড়ে ছিল লাশ। আহতদের অনেককে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এই হামলায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে। বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো, আটক ব্যক্তিদের হত্যা, লুটপাট, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগÑ সবকিছুই যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়তে পারে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, পরবর্তী সময়ে পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে যায় সম্পূর্ণভাবে। বর্তমানে সেখানে বসবাসের কোনো পরিবেশ নেই।
বেঁচে থাকাদের নতুন বন্দিদশা : যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, তাদের অনেককেই পরে আরাকান আর্মি আটক করে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের কাছ থেকে টাকা, গয়না ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বেঁচে যাওয়া মানুষদের একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে রাখা হয়, যেখানে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার তীব্র সংকট ছিল। অনেককে জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। কিছু মানুষ পরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাদের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে বাইরের বিশ্ব জানতে পারে হইয়ার সিরির গণহত্যার কথা।
সত্য গোপনের অভিযোগ : হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আরাকান আর্মি বেঁচে যাওয়া মানুষদের জোর করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করেছে। কিছু গ্রামবাসীকে ভিডিওতে বলতে বাধ্য করা হয় যে, আরাকান আর্মি তাদের রক্ষা করেছে। যদিও আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, তারা কেবল সশস্ত্র যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও স্যাটেলাইট চিত্র সেই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া : হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে এমন কোনো পরিস্থিতি নেই, যেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন সম্ভব। সংস্থাটির মতে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মিÑ উভয়পক্ষই রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং দুই পক্ষের সংঘাতের বলি হয়েছে সাধারণ মানুষ। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও শক্ত অবস্থান প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের পাশাপাশি এই হত্যাযজ্ঞের স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
শিবিরে অনিশ্চিত জীবন : বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জীবনও অনিশ্চয়তায় ভরা। কক্সবাজারের ঘিঞ্জি শিবিরে তারা নিরাপত্তাহীনতা, খাদ্যসংকট ও ভবিষ্যৎহীন জীবনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অনেকেই এখনো রাতে ঘুমাতে পারেন না। চোখের সামনে পরিবারের সদস্যদের হত্যার দৃশ্য বারবার ফিরে আসে। কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ বাবা-মা, কেউ পুরো পরিবার।
ওমর আহমদের মতো অনেকেই আজও বিশ্বাস করতে পারেন না, যে ধানখেতে একসময় তারা চাষ করতেন, সেই জমিই একদিন কবরস্থানে পরিণত হবে। রাখাইনের হইয়ার সিরি আজ শুধু একটি গ্রামের নাম নয়; এটি রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ নিপীড়ন, রাষ্ট্রহীনতা এবং বিচারহীনতার নির্মম প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন