× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০৬:১৯ এএম

বহুমেরু বিশ্বের ডাক

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০৬:১৯ এএম

বহুমেরু বিশ্বের ডাক

বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন বেইজিং। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত চীন সফরের কয়েক দিনের মধ্যেই চীনের রাজধানীতে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। দুই দিনের এই সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সফরের মাধ্যমে চীন ও রাশিয়া বিশ্বকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলÑ পশ্চিমা চাপ, নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যেও তাদের কৌশলগত সম্পর্ক অটুট রয়েছে। বুধবার সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান ভøাদিমির পুতিনকে। লাল গালিচা, সামরিক ব্যান্ড ও দুই দেশের জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে আয়োজিত হয় রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা। এরপর দুই নেতা একান্ত বৈঠকে মিলিত হন।

রুশ গণমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, বৈঠকের আগে দুই নেতা করমর্দন করে একসঙ্গে গ্রেট হলের ভেতরে প্রবেশ করেন। বৈঠকের শুরুতেই পুতিন বলেন, ‘প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও রাশিয়া ও চীনের সহযোগিতা ইতিবাচক গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন ‘অভূতপূর্ব উচ্চতায়’ পৌঁছেছে। অন্যদিকে শি জিনপিং বলেন, চীন ও রাশিয়া একে অপরের ‘কৌশলগত শক্তি’ হিসেবে কাজ করবে এবং সব ধরনের একতরফা দমননীতির বিরোধিতা করবে। যদিও কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বক্তব্যের লক্ষ্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা জোট।

বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান : বৈঠক শেষে দুই দেশ একটি যৌথ ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, কিছু রাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থ বিশ্বব্যাপী চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতার’ বহিঃপ্রকাশ। একই সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়, বিশ্ব আবারও ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক বিভক্তি, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও একতরফা আধিপত্যবাদের সমালোচনা করা হয়। রাশিয়া ও চীন নিজেদের ‘বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গঠনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষা শুধু কূটনৈতিক বার্তা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুই শক্তির অভিন্ন অবস্থানের প্রকাশ।

প্রায় ২০টির বেশি চুক্তি : শি-পুতিন বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একাধিক চুক্তি। ক্রেমলিন জানিয়েছে, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পর্যটন, শিক্ষা, গবেষণা ও মেধাস্বত্বসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ নথিতে সই হয়েছে। আরও কিছু চুক্তি পরে ঘোষণা করা হবে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দুই দেশ, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে যৌথ সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বৈঠকের পর দুই নেতা সাংবাদিকদের প্রশ্ন নেননি। তবে দুই পক্ষই আশা প্রকাশ করেছে, এসব চুক্তি চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

জ্বালানি নিরাপত্তাই মূল কেন্দ্রবিন্দু : বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল জ্বালানি নিরাপত্তা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ফলে নতুন বাজার খুঁজতে মস্কো এখন অনেক বেশি নির্ভর করছে বেইজিংয়ের ওপর। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া থেকে চীনে গ্যাস সরবরাহের বৃহৎ প্রকল্প ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মঙ্গোলিয়ার মধ্য দিয়ে নির্মিতব্য এই পাইপলাইন চালু হলে রাশিয়ার জন্য নতুন জ্বালানি বাজার খুলবে। পুতিন বলেন, রাশিয়া চীনে নিরবচ্ছিন্ন তেল ও গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে প্রস্তুত। অপরদিকে চীনও রুশ জ্বালানির অন্যতম বড় ক্রেতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় রাশিয়ার জন্য চীনের বাজার এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রাম্প সফরের পর নতুন কূটনৈতিক বার্তা : ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের পরপরই পুতিনের বেইজিং সফর আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, ট্রাম্পের সফরে বড় কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা যৌথ ঘোষণা না এলেও শি-পুতিন বৈঠকে একের পর এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন এভাবেই বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছে যে তারা একই সময়ে ওয়াশিংটন ও মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেও রাশিয়ার সঙ্গে তাদের কৌশলগত বন্ধন এখনো দৃঢ়। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক প্যাট্রিসিয়া কিমের মতে, শি ও পুতিনের সম্পর্ক ‘কাঠামোগতভাবে আরও স্থিতিশীল’। অন্যদিকে চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক টিমোথি অ্যাশ মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে রাশিয়া এখন অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি : বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাও আলোচনায় আসে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীন প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়নি। একই সঙ্গে ইরান-সংকট, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা চীনের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ, কারণ দেশটি জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

গোপন সামরিক সহযোগিতার অভিযোগ : এই সফরের মধ্যেই নতুন বিতর্কও সামনে এসেছে। কয়েকটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করেছে, চীনের সামরিক ঘাঁটিতে গোপনে রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ড্রোন যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও আকাশ প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রায় ২০০ রুশ সেনা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। যদিও বেইজিং এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইউক্রেন সংকটে তারা ‘নিরপেক্ষ অবস্থান’ বজায় রেখেছে এবং শান্তি আলোচনার পক্ষে কাজ করছে। তবে পশ্চিমা বিশ্ব মনে করছে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে টিকিয়ে রাখতে চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।

চীনের কৌশলগত উত্থান : বিশ্লেষকদের মতে, পুরো ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীনের কূটনৈতিক অবস্থান। কয়েক দিনের ব্যবধানে একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট, অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্টকে আতিথ্য দিয়ে বেইজিং দেখিয়ে দিয়েছেÑ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে চীনকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন নিজেকে এমন এক ‘নিরপেক্ষ পরাশক্তি’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, যে একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। পুতিনের সফর হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আনবে না। কিন্তু এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, বিশ্ব রাজনীতি এখন দ্রুত নতুন এক ভারসাম্যের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে চীন ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!