× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ২২, ২০২৬, ০৪:০৭ এএম

উষ্ণতা-খরা-বন্যার ত্রিমুখী ঝুঁকিতে বিশ্ব

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ২২, ২০২৬, ০৪:০৭ এএম

উষ্ণতা-খরা-বন্যার ত্রিমুখী ঝুঁকিতে বিশ্ব

প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠছে সমুদ্রের পানি। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই উষ্ণতা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ‘সুপার এল নিনো’তে রূপ নিতে পারে। আর সেটি ঘটলে পৃথিবীর আবহাওয়াব্যবস্থা ভয়াবহভাবে বদলে যেতে পারে। কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও ভয়াবহ বন্যা, কোথাও রেকর্ড তাপপ্রবাহÑ সব মিলিয়ে বৈশ্বিক জলবায়ুতে তৈরি হতে পারে অস্থির পরিস্থিতি।

আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হলে তাকে এল নিনো ধরা হয়। আর তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন সেটি ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে পরিচিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কারণ পৃথিবী ইতোমধ্যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে উঠেছে। তার ওপর এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়বে। এতে ২০২৬ কিংবা ২০২৭ সাল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কী এই এল নিনো : এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এটি ফিরে আসে এবং সাধারণত ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাংশে উষ্ণ পানি জমা থাকে এবং পূর্বাংশ তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে। কিন্তু এল নিনোর সময় বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বৈশ্বিক বায়ুম-লীয় ভারসাম্য বদলে যায়। এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, এমনকি অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় এর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কোথাও বৃষ্টিপাত কমে খরা হয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টিতে বন্যা দেখা দেয়।

বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের আতঙ্ক : বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে চলতি মৌসুমেই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। পাকিস্তানের করাচিতে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। সিন্ধু অঞ্চলে ৪৬ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছেছে। তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন শ্রমজীবী মানুষ, বাড়ছে পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের ঘটনা। ভারতের রাজস্থান, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রেও তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। বহু এলাকায় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে গরমজনিত রোগীর সংখ্যা। বাংলাদেশেও গত বছর দীর্ঘ তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা হয়েছে। টানা কয়েক সপ্তাহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় খরার ঝুঁকি : আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনোর সময় দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকায় খরার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশের রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলে বৃষ্টি কমে গেলে দ্রুত খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে সেচনির্ভর কৃষিতে চাপ বাড়ে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায় এবং খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়। কৃষিবিদদের আশঙ্কা, আমন ধানের মৌসুমে বৃষ্টি কম হলে চারা রোপণ ব্যাহত হতে পারে। আবার দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের পর হঠাৎ অতিবৃষ্টি হলে খেত তলিয়ে গিয়ে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে।

দাবানলে পুড়ছে বনভূমি : জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই আফ্রিকা ও এশিয়াজুড়ে বিপুল বনভূমি আগুনে পুড়ে গেছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকায় ইতোমধ্যে কয়েক কোটি হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস ও চীনের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটি ও বনাঞ্চল শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে সামান্য আগুনও দ্রুত ভয়াবহ দাবানলে রূপ নিচ্ছে।

কোথাও খরা, কোথাও বন্যা : এল নিনোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলোÑ একই সময়ে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিপরীতধর্মী আবহাওয়া তৈরি হয়। দক্ষিণ এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় যেখানে খরা বাড়তে পারে, সেখানে দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ও তৈরি হতে পারে। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এল নিনোর সময় বৃষ্টিপাতের ধরন অস্বাভাবিক হয়ে যায়। ফলে স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে। আবার দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়ায় খরাও তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার প্রবণতা বেড়েছে। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ফসলের ক্ষতি করছে, আবার দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বাড়ছে খরার প্রকোপ।

স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে : তীব্র তাপমাত্রা শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি এখন বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পরিণত হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ তাপপ্রবাহের কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া, কিডনি রোগ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু, বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শ্রমজীবী মানুষ। শহরাঞ্চলে গরমের সঙ্গে বিদ্যুতের সংকট ও জলাবদ্ধতা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে ডেঙ্গু, পানিবাহিত রোগ ও চর্মরোগের প্রকোপও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বড় সতর্কসংকেত : বাংলাদেশ সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের পাশে না থাকলেও বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব থেকে রেহাই পায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা বিলম্বিত হওয়া, কম বৃষ্টি, দীর্ঘ তাপপ্রবাহ ও আকস্মিক অতিবৃষ্টিÑ সব মিলিয়ে দেশের আবহাওয়ায় চরম ভাব বাড়তে পারে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই পানি সংরক্ষণ, খরাসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাসের ব্যবস্থা এবং নগর অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করা জরুরি।

তাদের মতে, এল নিনো আতঙ্কের নাম নয়; তবে এটি প্রকৃতির এমন একটি চক্র, যা জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে আরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনাই হতে পারে ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!