পশ্চিম ইউরোপজুড়ে চলমান ভয়াবহ তাপপ্রবাহ শুধু একটি মৌসুমি আবহাওয়ার ঘটনা নয়, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ডসহ বহু দেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গেছে। কোথাও কোথাও পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। এই তীব্র গরমে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে, স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে, বিদ্যুৎ ও পরিবহনব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের মূল কারণ হলো ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ আবহাওয়াগত পরিস্থিতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব, যা তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলছে।
কী এই ওমেগা ব্লক?
ওমেগা ব্লক এমন একটি আবহাওয়াগত বিন্যাস, যেখানে একটি শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় দুটি নি¤œচাপ বলয়ের মাঝখানে আটকে পড়ে। উপগ্রহচিত্রে এই বিন্যাস দেখতে গ্রিক বর্ণমালার ‘ওমেগা’ অক্ষরের মতো হওয়ায় এর নাম হয়েছে ওমেগা ব্লক। স্বাভাবিক অবস্থায় বায়ুম-লের শক্তিশালী পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করে। কিন্তু ওমেগা ব্লক তৈরি হলে সেই প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে উচ্চচাপ বলয় দীর্ঘ সময় একই স্থানে স্থির থাকে। এর কারণে গরম ও শুষ্ক বাতাস একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে আটকে যায়। আকাশে মেঘ তৈরি হতে পারে না, বৃষ্টির সম্ভাবনা কমে যায় এবং সূর্যের তাপ সরাসরি ভূপৃষ্ঠে এসে পড়তে থাকে। এতে দিনের পর দিন তাপমাত্রা বাড়তেই থাকে। সাধারণত এই ধরনের আবহাওয়াগত পরিস্থিতি তিন থেকে দশ দিন স্থায়ী হলেও অনেক সময় তা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্তও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
রেকর্ড ভাঙছে তাপমাত্রা : ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিসোস শহরে তাপমাত্রা ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। রাজধানী প্যারিসেও জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড গড়েছে। জার্মানির কয়েকটি এলাকায় ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ডেনমার্কেও দেড় শতাব্দীর বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে তীব্র দাবদাহ দেখা দিলেও উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে তুলনামূলক শীতল ও বৃষ্টিপ্রবণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ওমেগা ব্লকের অবস্থানগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই এমন বৈপরীত্য দেখা দিচ্ছে।
বাড়ছে প্রাণহানি : তীব্র গরমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ফ্রান্সে প্রচ- গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে পানিতে নেমে ডুবে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গাড়ির ভেতরে অতিরিক্ত তাপের কারণে কয়েকটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। স্পেনে হিটস্ট্রোকে প্রাণ হারিয়েছেন প্রবীণ নাগরিকেরা।
জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব : তীব্র গরমে ইউরোপের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। শত শত স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে অথবা পাঠদানের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। রেললাইনে অতিরিক্ত তাপের প্রভাবে ক্ষতির আশঙ্কায় বিভিন্ন দেশে ট্রেনের গতি সীমিত করা হয়েছে। জার্মানিতে সড়কের পিচ ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি ও অর্থনীতিতেও চাপ : দাবদাহের প্রভাব পড়েছে কৃষি উৎপাদনেও। ফ্রান্সের কৃষকেরা দুপুরের পরিবর্তে গভীর রাতে ফসল কাটতে বাধ্য হচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমেগা ব্লক নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
শিল্পবিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড় এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনের ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়াগত ঘটনাগুলো আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে বর্তমানে যে তাপপ্রবাহ হচ্ছে, তা প্রাকৃতিক অবস্থার তুলনায় কয়েক ডিগ্রি বেশি উষ্ণ। অর্থাৎ একই ধরনের ওমেগা ব্লক অতীতে তৈরি হলেও বর্তমানের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।
ভবিষ্যতের ইঙ্গিত : আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপের কিছু এলাকায় অস্থায়ীভাবে বজ্রবৃষ্টির মাধ্যমে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও চলতি গ্রীষ্মে আরও কয়েক দফা তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ওমেগা ব্লকের মতো দীর্ঘস্থায়ী আবহাওয়াগত পরিস্থিতি আরও বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি এখনকার বাস্তবতা। এই বাস্তবতা শুধু একটি মহাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যই সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমাতে বৈশ্বিক উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি দেশকে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ, খরা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন