× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরফান হোসাইন রাফি

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৭:২৮ এএম

লাখ টাকার চা-ওয়ালা

আরফান হোসাইন রাফি

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৭:২৮ এএম

রুদ্র রনি। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

রুদ্র রনি। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

পকেট ভরতি অভাব আর মাথা ভরতি দুশ্চিন্তা নিয়ে বেঁচে থাকার তাড়নাই প্রেরণা জুগিয়েছিল ফরিদপুরের মাঝারদিয়া ইউনিয়নের খালিশপুট্টী গ্রামের বাসিন্দা, রোজিনা বেগম এবং শওকত মোল্লার সন্তান রুদ্র রনিকে। ইচ্ছা বনাম অক্ষমতার লড়াইয়ে বারবার অনার্স থেকে ছিটকে পড়া পরিবারের ব্যর্থ বেকার ছেলেটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠল কুসুমকুমারী দাশের সেই কাক্সিক্ষত আদর্শ ছেলে ‘মুখে হাসি, বুকে বল, তেজে ভরা মন, মানুষ হইতে হবে এই তার পণ’। এমন পণ হয়তো জন্মায়নি এক দিনে কিংবা দুই দিনে। এর পেছনে নিশ্চয়ই রয়েছে অগণিত নির্ঘুম রাত আর গালমন্দের বর্ষণে ঝরে যাওয়া নীরব চোখের জল।

এসব গল্প জানতে কল করা হলো ফরিদপুরের ব্যস্ততম চা-ওয়ালা রুদ্র রনিকে। গড়িমসি করে কেটে গেল একটি সপ্তাহ। এরপর এক দিন মধ্যরাতে কল ধরতেই নির্ভেজাল হাসির শব্দের সঙ্গে ভেসে এলো, ‘আমরা তো বাজারের জোকার হয়ে গেছি ভাই, হে হে হে।

বাজারে টিকে থাকার জন্য অনেক কিছু করতে হয় আমাদের পুরুষ মানুষের, যা আমরা ব্যক্তিগত জীবনে কোনোদিনই চাই না। হে হে হে।’ তারপর অপ্রাসঙ্গিক নানা যুক্তিতর্কের শেষে জানতে চাওয়া হলো, এক সময়ের বেকার ছেলেটি আজ কীভাবে ফরিদপুরের ব্যস্ততম চা-ওয়ালা, মাসিক আয় যার লাখ টাকা? আপন ছন্দে আরও একবার নির্ভেজাল হাসি দিয়ে শুরু থেকে জানালেন রনি নিজেই।

অভাবের দিনগুলো

দুই হাজার সতেরোতে এসএসসি শেষ করেও অভাবের পৃথিবীতে ধারাবাহিক পড়াশোনা করা হয়নি রনির। ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে অনার্সে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হলেও পড়াশোনায় খানিক বিরতি নিয়ে ঢাকার কারওয়ান বাজারে বাবার সঙ্গেই কাঁচামালের ক্ষুদ্র ব্যবসায় হাত দিয়েছিল। কিন্তু ঋণের বোঝা আর মানসিক চাপ এই হাতকে দীর্ঘজীবী করতে পারেনি। তখন রনি রাজেন্দ্র কলেজে সবে প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছে। ব্যবসা থেকে তাদের মাসিক রোজগার ছিল ৪০ হাজার টাকা। সামান্য অঙ্ক কষলে দেখা যায়, ঋণের তুলনায় যার পরিমাণ ২০ হাজার কম। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ির উঠোনে থাকত পাওনাদারদের শোরগোল আর গালমন্দের উচ্ছিষ্ট হাওয়া।

এসব হাওয়া কাঁটার মতো গায়ে লাগত একটু দূরের ঘরে থাকা পরিবারের বড় ছেলেটির। নির্দ্বিধায় সব সহ্য করে যাওয়া প্রতিবাদহীন মায়ের চোখের জল দেখে নিজের প্রতি তার প্রচণ্ড ঘৃণা হতো। ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে জেগে থাকত রাতের পর রাত। চাকরির জন্য চেষ্টা করেনি, এমনটা নয়। প্রবল আকাক্সক্ষা নিয়ে বাবার পরিচিত এক ভাইয়ের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেও আগ্রহ দেখায়নি নিকটতম সেই ভদ্রলোক। কিন্তু রনি তার চেষ্টা থামায়নি; চেয়েছিল বিদেশে পাড়ি জমাতে। তবে টাকার কাছেই শেষ পর্যন্ত আটকে যায় শেষ ভরসাটুকুও। এরপর বিদিশা হয়ে স্রষ্টার নিকট পৃথিবী থেকে সরিয়ে নেওয়া কিংবা মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাওয়ার প্রার্থনা আর প্রতিনিয়ত চোখের জলেই দিন কাটছিল তার। তবে সেই দিন কাটিয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নতুনভাবে স্বপ্ন দেখল সে।

রনি থেকে চা-ওয়ালা রনি

একদিন রনি কৌতূহলবশত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে লিখেন, ‘আপনাদের আগ্রহ পেলে আমি একটা চায়ের দোকান দিতে চাই।’ পোস্টটির পরপরই এক বন্ধু তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। সে বলে, ‘চায়ের দোকান দিতে পারলে ভালোই হবে। কোথায় দোকান দিতে চাস? আমি তোকে সাহায্য করতে চাই।’ কোনো দ্বিধা না করেই রনি উত্তর দেয়, ‘রাজেন্দ্র কলেজের সামনে।’ এরপর বন্ধুটি পরিকল্পনামাফিক জায়গা খুঁজে বের করে। শূন্য হাতেই দোকানটি দেখে কনফার্ম করে আসে রনি। শুরুতে দোকানের অ্যাডভান্স টাকা ভাই-বন্ধুদের কাছ থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে কেউ নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসেনি। কেউ নিজেই দোকানটি নিয়ে কাজ করাতে চেয়েছিল, আবার কেউ ব্যবসার পার্টনার হতে আগ্রহ দেখিয়েছিল।

এই অবস্থায় মা-বাবাকে না জানিয়েই দোকান নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বিষয়টি জানাতেই হয়। মাকে জানালে মা সাহস দিয়ে বলেছিল, ‘তুই যা ভালো বুঝিস, কর।’ কিন্তু বাবাকে বলার পর তিনি রাজি হননি। তার যুক্তি ছিল, ছেলে পড়াশোনা করছে, সে কেন চায়ের দোকান করবে? পরে মা বুঝানোর পর অবশেষে তিনি অনুমতি দেন। তবে আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতির বিপরীতে হেঁটে মা নতুন করে ৬০ হাজার টাকা কিস্তিতে তুলে রনির ব্যবসা শুরু করিয়ে দেন। যদিও তখন রনি ঠিকভাবে চা বানাতেও জানত না। ফলে টানা আট মাস কোনো লাভ তো হয়ইনি, বরং ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।

এমনকি বাবার কাছ থেকেই দোকানের ভাড়া নিতে হয়। এই সময়ে পাওনাদারদের গালাগাল ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। মাঝেমধ্যে মা দোকানে এসে কান্নায় ভেঙে পড়তেন। তবু রনি থামেনি। দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম, ধৈর্য আর আল্লাহর কাছে কান্নাকাটির ফল হিসেবে একসময় দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। হঠাৎ করেই মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে তার স্বপ্নের হইচই ক্যাফেতে। দীর্ঘ আট মাস পর প্রথমবারের মতো রনি মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা পরিবারকে দিতে সক্ষম হয়। এরপর খুচরা পাওনাদারদের ঋণ পরিশোধের জন্য সে আবার বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, যার মাসিক কিস্তি এখন এক লাখ টাকা। তবে আশার কথা হলো, এই পুরো কিস্তির টাকাই সে এখন দোকান থেকেই পরিশোধ করতে পারছে।

নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন

নিজেকে নিয়ে রনির স্বপ্ন খুবই সাধারণ। সে চা-ওয়ালাই হয়ে থাকতে চায়। তার কাছে সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো, সে পার্লামেন্টেও গিয়ে গর্ব করে বলতে পারবে, ‘আমি একজন চা-ওয়ালা।’ কারণ একজন চা-ওয়ালাও সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, এই বিশ্বাসটাই রনির শক্তি। তাই তো পাল্টে গেছে তার পরিচয়, পাল্টেছে নাম। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড় রনি। দুই বোনের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। সংসারের দায়িত্ব, অভাব আর বাস্তবতার মাঝেও সে স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়নি। তার স্বপ্ন, একটি বড় ক্যাফে হবে, যা দেশ ও দেশের বাইরে পরিচিতি পাবে।

সেখানে থাকবে সুন্দর চা খাওয়ার পরিবেশ। পাশাপাশি সে অনার্স ফাইনাল ইয়রের আটকে যাওয়া পরীক্ষাগুলো দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় একজন গ্র্যাজুয়েট চা-ওয়ালা হিসেবে। সমাজের কাছে রনির স্পষ্ট বার্তা ‘চা বিক্রি করেও সমাজের দায়িত্বশীল অংশ হওয়া যায়, কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়, আর বেকারত্ব দূর করতে ভূমিকা রাখা যায়।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!