ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মেধার নবায়ন ও আগামীর শ্রমবাজার

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০৭:০৫ এএম

পেশাদার জগতের চিরচেনা দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এক সময় মনে করা হতো প্রযুক্তির উৎকর্ষ কেবল কায়িক শ্রমের জায়গাগুলো দখল করবে। তবে গত কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্সের যে বিস্তৃতি আমরা দেখেছি, তা প্রমাণ করেছে যে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের ধরনেও বিশাল রূপান্তর আসন্ন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিবর্তন কেবল গতির লড়াই নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সস্তা শ্রমের মোহ কাটিয়ে উচ্চতর দক্ষতার দিকে ধাবিত হওয়া এখন বিকল্প নয়, একমাত্র পথ। আগামী দশকের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পেশা নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন : প্রযুক্তি এখন মূলধারার বাইরের কোনো বিশেষায়িত খাত নয়, বরং দিন দিন এটি প্রতিটি পেশার হৃৎপি-ে পরিণত হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে এআই আমাদের সহকর্মী হিসেবে স্থায়ী আসন করে নেবে, সেটা বোঝা যাচ্ছে ভালোভাবেই। তবে মেধার এই ডিজিটালাইজেশন মানেই মানুষের কর্মসংস্থান সংকোচন নয়, বরং কাজের স্তরে এক গুণগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা। আগামী দিনগুলোতে সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন পেশা হিসেবে আবির্ভূত হবে এআই মডেল টিউনিং ও মেশিন লার্নিং অপারেশনস। স্রেফ এআই ব্যবহার জানলেই চলবে না, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টম এআই মডেল তৈরি ও তার নৈতিক মানদ- বজায় রাখতে দক্ষ প্রকৌশলীদের প্রয়োজন পড়বে।

পরিবেশ রক্ষার নতুন অর্থনীতি : জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এখন কেবল সেমিনার বা আলোচনার বিষয় নয়, এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান শর্তে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা থেকে এক বিশাল কর্মবাজার সৃষ্টি হচ্ছে। নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ খাতে দক্ষ টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদার পাশাপাশি সার্কুলার ইকোনমি স্পেশালিস্টদের গুরুত্ব সামনে বাড়বে। এরা পণ্যের বর্জ্যকে পুনরায় কাঁচামালে রূপান্তর করার প্রকৌশল নিয়ে কাজ করবেন। বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখন শুধু মুনাফা গোনে না, তারা তাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট নিয়েও চিন্তিত। ফলস্বরূপ, সাস্টেনিবিলিটি কনসালটেন্ট বা পরিবেশবান্ধব ব্যাবসায়িক পরামর্শকদের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী।

হাই-টাচ জবস : যান্ত্রিকতা যত প্রকট হবে, মানুষের প্রতি মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যের প্রয়োজনীয়তা তত বেশি অনুভূত হবে। যে কাজগুলো রোবট বা অ্যালগরিদম দিয়ে সম্পন্ন করা অসম্ভব, সহমর্মিতা ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা যেখানে মূল ভিত্তি, সেই পেশাগুলোই হবে আগামীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। বিশ্বজুড়ে প্রবীণ জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রফেশনাল কেয়ারÑ গিভিং ও আধুনিক জীবনের মনস্তাত্ত্বিক চাপের কারণে মেন্টাল হেলথ থেরাপিস্ট বা কাউন্সিলরদের প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিখুঁত ডেটা দিতে পারে, কিন্তু মানুষের চোখের ভাষা বা বিষণœতার গভীরতা বোঝার ক্ষমতা তার নেই। এই পেশাগুলোকে বলা হচ্ছে হাই-টাচ জবস, যেখানে প্রযুক্তির চেয়ে মানুষের স্পর্শই আসল শক্তি।

স্মার্ট অবকাঠামো : অনাগত সময়ের শহরগুলো গড়ে উঠবে ডেটা ও সেন্সরের ওপর ভিত্তি করে, যাকে আমরা স্মার্ট সিটি বলছি। এই অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রথাগত রাজমিস্ত্রি বা ইলেকট্রিশিয়ানের বদলে প্রয়োজন হবে স্মার্ট কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার ও আইওটি টেকনিশিয়ান। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে আগামী দশকে ইভি চার্জিং স্টেশন স্থাপন ও ব্যাটারি প্রযুক্তিতে দক্ষ মেকানিকদের  বিশাল বাজার তৈরি হবে। অটোমেশনের যুগেও দক্ষ হাতের কাজ বা ক্রাফটসম্যানশিপ বিলুপ্ত হবে না, বরং তা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মিলে নতুন রূপ পাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মেগা প্রজেক্টগুলোর ব্যবস্থাপনায় ডেটা-চালিত প্রজেক্ট ম্যানেজারদের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরা একই সঙ্গে প্রকৌশল বিদ্যা ও তথ্যপ্রযুক্তি; দুই জগতেই পারদর্শী হবেন।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট : বাংলাদেশের জন্য আগামী এক দশক হলো নিজেকে প্রমাণের সময়। এতদিন আমরা মূলত সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে টিকে ছিলাম। তবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা কমতে শুরু করলে আমাদের সামনে একমাত্র পথ হবে উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমবাজার। কৃষি খাতে স্মার্ট ফার্মিং, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং বা ফিনটেক ও ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে রিমোট ওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে। তরুণদের জন্য স্রেফ একটি ডিগ্রি অর্জন যথেষ্ট নয়; প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি টেকনিক্যাল ও সফট স্কিলের সমন্বয় ঘটানো এখন সময়ের দাবি। অধ্যাপক লিবি স্যান্ডার সতর্ক করে বলেছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে যারা সফট স্কিল বা যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করতে পারবে না, তারা দ্রুত পেশাগত ক্লান্তির শিকার হবে। তার মতে, আগামীর বাজারে টিকে থাকার মূলমন্ত্রÑ প্রযুক্তিকে সঙ্গী বানানো, প্রতিযোগী নয়।

প্রস্তুতি : বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিবর্তনশীল সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনটি প্রধান কৌশলে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজনÑ

ক্রস-স্কিলিং : বিষয়ের ছাত্র যা-ই হোন না কেন, তার সঙ্গে প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ঘটান। একজন হিসাবরক্ষক ডেটা অ্যানালাইসিস জানলে কিংবা চিকিৎসক টেলি-মেডিসিন প্রযুক্তিতে দক্ষ হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হবে।

কন্টিনিউয়াস লার্নিং : শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বয়সে শেষ হয় না। নতুন সফটওয়্যার, টুলস বা ফ্রেমওয়ার্ক শেখার মানসিকতা বজায় রাখতে হবে। ‘কীভাবে শিখতে হয়’Ñ তা আয়ত্ত করাই হবে শ্রেষ্ঠ দক্ষতা।

আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও নেতৃত্ব : রোবট কাজ করতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে বা মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারে না। জটিল সমস্যা সমাধান, সৃজনশীল চিন্তা ও কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা হবে আপনার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

আগামীর পেশাগুলো তাদের জন্যই অপেক্ষা করছে, যারা পরিবর্তনের তোড়ে ভেসে না গিয়ে সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস রাখে। প্রযুক্তির যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে আমাদের মানবিকতা ও মেধার নিরন্তর বিবর্তন। আগামীর পৃথিবী ঠিকানার খোঁজ নেবে না, নেবে আপনার সক্ষমতার স্বাক্ষর।