ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্ক্রিনের আলোয় নিভে যাচ্ছে সম্পর্কের উষ্ণতা

মেহরুন নিশি
প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম

স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুলের হালকা ছোঁয়ায় এখন পুরো পৃথিবী যেন হাতের মুঠোয়। সকালে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত দিনের বড় একটি অংশ কাটছে ডিজিটাল ডিভাইসের সঙ্গে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ক্লাস, গেমিং, ভিডিও স্ট্রিমিং সব মিলিয়ে তরুণদের জীবন যেন এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। এই বাস্তবতা আধুনিক, দ্রুতগামী এবং সম্ভাবনাময় কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধও। কারণ, এই ডিজিটাল বিস্ফোরণের ভিড়ে বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ কোথাও যেন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে তরুণদের সামনে খুলে গেছে এক অভূতপূর্ব সম্ভাবনার দিগন্ত। একসময় বিদেশে পড়াশোনা বা কাজ করা ছিল অনেকের জন্য স্বপ্নের মতো। এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিশ্বমানের শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব। ইউটিউব, অনলাইন কোর্স কিংবা ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস এসবের মাধ্যমে অসংখ্য তরুণ নিজের দক্ষতা উন্নয়ন করছে এবং আয়ও করছে। প্রযুক্তি তাদের দিয়েছে স্বাধীনতা, দিয়েছে নিজের মতো করে জীবন গড়ার সুযোগ।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তথ্য পাওয়া আর কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। কয়েকটি ক্লিকেই পাওয়া যায় প্রয়োজনীয় জ্ঞান, শেখা যায় নতুন কিছু। ফলে তরুণদের চিন্তাভাবনায় এসেছে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। তারা এখন কেবল নিজের দেশ নয়, পুরো বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত। এই সংযোগ তাদের স্বপ্নকে বড় করেছে, চিন্তাকে করেছে বিস্তৃত।

কিন্তু এই সহজলভ্যতা ও সংযোগের বিপরীত দিকও রয়েছে। বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলো যেন ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল সম্পর্কের কাছে জায়গা হারাচ্ছে। একসময় বিকেলের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, পাড়ার আড্ডা কিংবা পরিবারের সঙ্গে গল্প, এসব ছিল তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মোবাইল স্ক্রিন। পাশে বসে থাকা মানুষটির সঙ্গে কথা না বলে, দূরে থাকা কারো পোস্টে লাইক বা কমেন্ট করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে অনেকেই।

এই পরিবর্তনের ফলে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা, যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজারো বন্ধু, কিন্তু বাস্তবে মনের কথা বলার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যের সাজানো-গোছানো জীবনের ছবি দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে অনেক তরুণ হতাশায় ভুগছে। আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে, নিজের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে।

আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো সময়ের অপচয়। অনেক তরুণই না বুঝেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করে বা অনলাইন গেমে ডুবে থেকে। এই সময় যদি সৃজনশীল কাজে, পড়াশোনায় বা দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় করা যেত, তা হলে তা ভবিষ্যতের জন্য অনেক বেশি উপকারী হতো। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তাই যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অজান্তেই তৈরি করছে আসক্তির ফাঁদ।

তবে পুরো বিষয়টিকে একপেশে দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। প্রযুক্তি নিজে কখনো ভালো বা খারাপ নয়। এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে এর প্রভাব। যে তরুণ নিজের সময়কে

সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, সে ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে নিজেকে এগিয়ে নিতে পারছে। আবার যে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, সে-ই পিছিয়ে পড়ছে।

বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, যেমন মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা, খেলাধুলা করা বা পরিবারকে সময় দেওয়াÑ এসবের বিকল্প কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দিতে পারে না। এই অভিজ্ঞতাগুলোই একজন মানুষকে মানসিকভাবে সুস্থ ও পরিপূর্ণ করে তোলে। তাই ডিজিটাল জীবন যতই আকর্ষণীয় হোক, বাস্তব জীবনের গুরুত্ব কখনো কমে না।

বর্তমান প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দুই জগতের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, আবার এর মধ্যে পুরোপুরি ডুবে যাওয়াও ক্ষতিকর। তাই প্রয়োজন সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে মোবাইল ব্যবহার না করা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোÑ এসব ছোট ছোট অভ্যাস বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তরুণদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে না দিয়ে, তাদের বোঝাতে হবে সঠিক ব্যবহার ও অপব্যবহারের পার্থক্য। তাদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তারা বাস্তব জীবনকে উপভোগ করার সুযোগ পায়।

ডিজিটাল জীবন আমাদের এগিয়ে নিচ্ছে, নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তব জীবনই আমাদের অনুভূতি, সম্পর্ক ও অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলো যেন বাস্তবতার উষ্ণতাকে ম্লান না করে এই সচেতনতা তৈরি করাই আজকের সময়ের দাবি। তরুণদের হাতেই ভবিষ্যৎ, আর সেই ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারা কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই দুই জগতের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করতে পারে তার ওপর।