ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি ঋণ বেশি দেখিয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বোর্ড ভাঙার ষড়যন্ত্র করছেন স্বয়ং ব্যাংকটির বিতর্কিত এমডি হাবিবুর রহমান।
অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চার্জশীটভুক্ত আসামি এমডি মো. হাবিবুর রহমান নিজের চাকরি বাঁচানো ও দীর্ঘদিনের অপকর্ম আড়াল করতেই এ পন্থা অবলম্বন করেছেন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ (বোর্ড) ভেঙে দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
তথ্যমতে, হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, ঋণ কেলেঙ্কারি, নাম নকল জালিয়াতি এবং বিতর্কিত পুনঃনিয়োগ ও তার পূর্বের চাকরি প্রতিষ্ঠানে এস আলম গ্রুপ, রংধনু বিল্ডার্সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকায় সম্প্রতি তাকে এমডি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। বোর্ড মিটিংয়ের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধও করা হয়েছিল। কিন্তু বোর্ড মিটিংয়ের এই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিতর্কিত এমডিকে বহাল রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
শুধু তাই নয়, বোর্ড যেন হাবিবকে এমডি পদ থেকে সরাতে না পারে, সেই লক্ষ্যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের খারাপ ঋণের পরিমাণ বেশি বেশি দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদকে বিলুপ্ত করে এমডির মনমতো একটি বোর্ড পুনর্গঠনের জন্য হাবিবুর রহমান জোর তদবির চালাচ্ছে। এমডির এই চেষ্টা সফল হলে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যাংকিং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকের বর্তমান কোনো পরিচালক কোনো ঋণ অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও শুধু এমডির দ্বারা কৃত্রিম উপায়ে বাড়ানো অনিয়মিত ঋণ দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি বোর্ডে কোনো হস্তক্ষেপ করে সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাগণও আইনি জটিলতা এড়াতে পারবেন না। এমনকি আদালত কর্তৃক এইরূপ হস্তক্ষেপ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অবৈধ ঘোষণা হতে পারে ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ আসতে পারে।
উল্লেখ্য, হাবিবুর রহমান দুদকের চার্জশীটভুক্ত একজন প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ মামলার আসামি। এ ছাড়াও তিনি ইউনিয়ন ব্যাংকে চাকরিরত অবস্থায় এস আলম গ্রুপের অনুকূলে ২৬০০ কোটি টাকাসহ রংধনু গ্রুপকেও (আন্ডা রফিক) শত শত কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রদান করেছেন বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন রিপোর্টে উঠে এসেছে। তিনি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক হতে শত শত পুরনো কর্মকর্তাদের বিনা বিচারে ছাঁটাই করে তার দুর্নীতির দোসরদের ব্যাংকে অবৈধ নিয়োগ দিয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক প্রায় দখল করে নিয়েছেন।
এ সব কারণে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বোর্ড তাকে আর এমডি পদে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে একটিও বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়নি হাবিবুর রহমানের অসহযোগিতার কারণে। এবারই প্রথম বছর শেষে এক টাকার ঋণও পুনঃতপশিলীকরণ হয়নি।
জানা গেছে, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বিনিয়োগ বিভাগ প্রায় ২০০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিল করে টাকা আদায়ের প্রস্তাব দিলে হাবিব সেটি প্রত্যাখ্যান করেন যেন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমে না যায়। কারণ খেলাপি ঋণ যত বেশি দেখানো যাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বোর্ড বিলুপ্ত করা তার জন্য তত সহজ হবে। একজন এমডি কিভাবে নিজের ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়ানোর জন্য এমন মরিয়া আচরণ করতে পারেন, সেটি ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতেন না। এভাবে কৃত্রিম উপায়ে মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংককে দেখাচ্ছেন যে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ। অথচ এ সব ঋণ যেন পরিশোধ করা না হয় তিনি সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন এবং ঋণ পরিশোধের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
উল্লেখ্য যে, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের বর্তমানে দায়িত্ব পালনরত কোনো পরিচালক কোনো ঋণ অনিয়মের সঙ্গে দায়ী এমন কোনো রিপোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণ হয়নি। এইরূপ অতিরিক্ত খেলাপি ঋণের মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিভ্রান্ত করে, চাকরি হারানোর এক মাস আগে ব্যাংকটিকে ধ্বংস করে হলেও তিনি নিজের চাকরি রক্ষার শেষ চেষ্টা করছেন।
-20251226025227.webp)

