বিমা খাতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা গ্রাহকের দাবি (ক্লেইম) পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নতুন চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। একই সঙ্গে দুর্বল বিমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে আলাদা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে দাবি নিষ্পত্তি, কমিশন বাণিজ্য বন্ধ, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালু, ইউনিক পলিসি আইডি কার্যকর এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বিমা খাতে এখন সবচেয়ে বড় সংকট হলো গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এজন্য প্রথম কাজ হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব বকেয়া দাবি পরিশোধ শুরু করা। দাবি পরিশোধ শুরু হলে ধীরে ধীরে গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসবে এবং তখন পুরো খাতকে স্থিতিশীল করা সহজ হবে। তিনি জানান, গত দুই সপ্তাহে সবচেয়ে সংকটাপন্ন সাতটি বিমা কোম্পানির মালিকপক্ষ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে আইডিআরএ। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, বিনিয়োগ ও আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। কোথাও সম্পদের মূল্যায়নে সন্দেহ থাকলে নতুন করে মূল্যায়নের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, এসব কোম্পানির জমি, ট্রেজারি বন্ড, বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদ ধাপে ধাপে বিক্রি করে অর্থ একটি পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। প্রতিটি কোম্পানির জন্য আলাদা হিসাব থাকবে এবং সেখানে নিরীক্ষক (অডিটর) যুক্ত থাকবেন। পরে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট (এফআইএফও)’ পদ্ধতিতে অর্থাৎ আগে যাদের দাবি জমা পড়েছে, তাদের আগে পরিশোধ করা হবে।
চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে লাইফ ও নন-লাইফ মিলিয়ে বিমা খাতে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বকেয়া দাবি রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র সাতটি কোম্পানির কাছেই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি আটকে আছে। তাই প্রাথমিকভাবে এই সাতটি কোম্পানিকেই লক্ষ্য করে কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, সম্পদ নগদায়নের ক্ষেত্রে চারটি উৎস বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো- ভালো ব্যাংকে থাকা এফডিআর, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিক্রিযোগ্য জমি এবং অন্যান্য বিনিয়োগ। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
চেয়ারম্যান বলেন, বিমা খাতে অতিরিক্ত কমিশন দেওয়ার প্রবণতা এখনো বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বেতনের আড়ালে বা বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে কমিশন দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি মোকাবিলায় আইডিআরএ কাজ করছে। কীভাবে এ ধরনের গোপন কমিশনের প্রমাণ সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিমা কোম্পানিগুলোর ওপর প্রচলিত কমপ্লায়েন্সভিত্তিক তদারকির পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (রিস্ক বেইজড সুপারভিশন) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আসে, সেগুলো অনেক পুরোনো। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যায় না। নতুন পদ্ধতিতে নিয়মিত ও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানির ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। এতে অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। গ্রাহক সুরক্ষায় ইউনিক পলিসি হোল্ডার আইডি চালুর বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে আইডিআরএ। চেয়ারম্যান বলেন, একটি বৈধ বিমা পলিসির বিপরীতে গ্রাহকের মোবাইল নম্বরে ইউনিক আইডি চলে আসবে। ভবিষ্যতে কোনো গ্রাহক যদি এই আইডি না পান, তা হলে তিনি যেন ওই পলিসিতে প্রিমিয়াম না দেন। এ বিষয়ে দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিমা কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত সনদ জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি আইডিআরএর নজরে রয়েছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই আরও কঠোর করা হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক ডেটাবেজ ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট বিশ^বিদ্যালয়ের তথ্য যাচাই, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় এবং সিআইবির মাধ্যমে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুর্বল কোম্পানির জরিমানা পরিচালকদের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে আদায় করা যায় কি? এ ধরনের এক প্রশ্নের উত্তরে চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যমান আইনে এমন সুযোগ নেই। তাই এখনই এটি করা সম্ভব নয়। তবে বিষয়টি নীতিগতভাবে আলোচনায় রয়েছে। বিমা কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, খাতটিতে বহুস্তরীয় সমস্যা রয়েছে। তাই সব বিষয়ে একসঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ ও খাতকে স্থিতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরপর যেসব ক্ষেত্রে অর্থ আত্মসাৎ বা অবৈধ কর্মকা-ের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সংস্থাটিতে জনবল সংকট রয়েছে। আগের নেতৃত্ব জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও বর্তমানে সরকারি নিয়োগ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বিকল্প উপায়ে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন ও তদারকি আরও জোরদারের উপায় খুঁজছে আইডিআরএ। তিনি বলেন, বিমা খাতকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকার, অন্যান্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি এবং গণমাধ্যম সব পক্ষের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার, এরপর ধাপে ধাপে পুরো খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা।

