বছর ঘুরে আবার এলো পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। মুসলমানদের অন্যতম বড় এই ধর্মীয় উৎসবের মূল কথাই হলো ত্যাগ ও আনন্দ। তবে এই ঈদের আমেজটা কিন্তু অন্য যেকোনো উৎসবের চেয়ে কিছুটা আলাদা। একদিকে কোরবানির ব্যস্ততা, অন্যদিকে অতিথি আপ্যায়ন আর মাংসের নানা পদের বাহারি আয়োজন। সব মিলিয়ে ব্যস্ততার কমতি থাকে না।
কোরবানির ঈদে বাড়িজুড়ে একটা অন্যরকম কর্মব্যস্ততা থাকে। আর এই ব্যস্ততার মাঝেই নিজের চিরচেনা ঘরটিকে একটু পরিপাটি ও উৎসবমুখর করে তোলা চাই। যেহেতু এই ঈদে মেহমানদের আনাগোনা এবং খাওয়ার আয়োজনটা একটু বেশি থাকে, তাই অন্দরসজ্জায় দরকার কিছুটা ভিন্ন কৌশল। এবারের কোরবানির ঈদে আপনার ঘরকে কীভাবে সহজ উপায়ে নান্দনিক ও ফ্রেশ করে তুলবেন, তা নিয়েই আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজন।
শুরুটা হোক পরিচ্ছন্নতা ও গন্ধমুক্তির প্রস্তুতি দিয়ে
কোরবানির ঈদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঘরদোর পরিষ্কার রাখা এবং মাংসের একটা চর্বট গন্ধ থেকে মুক্ত থাকা। ঈদের অন্তত দু-তিন দিন আগেই ঘরের কোনাকুনি, সিলিং ফ্যান, দেয়াল ও আসবাবপত্রের ধুলাবালি ভালো করে ঝেড়ে মুছে নিন। সোফা ঝেড়ে পরিষ্কার করার পাশাপাশি রেগুলার কুশন কভারগুলো বদলে নতুন সুতি বা সিল্কের কভার দিন। কোরবানির দিন সকাল থেকেই ঘরে সুগন্ধিযুক্ত মোমবাতি, রুম ফ্রেশনার, কিংবা ইলেকট্রিক ডিফিউজার ব্যবহার করুন। লেমনগ্রাস বা জেসমিন ফ্লেভারের সুগন্ধি ঘরের ভারী ভাব বা গন্ধ দূর করে নিমেষেই একটা ফ্রেশ উৎসবের আমেজ নিয়ে আসবে।
প্রথম দর্শনেই মুগ্ধতা
ঈদের দিন মাংস দেওয়া-নেওয়া কিংবা সালামি বিনিময়ের জন্য মূল দরজায় মানুষের আনাগোনা থাকে সবচেয়ে বেশি। তাই দরজার দুই পাশে রাখতে পারেন সতেজ ইনডোর প্লান্টসÑ যেমন মানি প্লান্ট, স্পাইডার প্লান্ট বা ক্যাকটাস। দরজায় এবং জানালায় দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে হালকা রঙের ট্রান্সলুসেন্ট (আলো-ছায়া তৈরি করে এমন) বা সুতি পর্দা ব্যবহার করতে পারেন। কোরবানির ঈদে বারবার মানুষ আসা-যাওয়া করায় ভারী পর্দা না দিয়ে হালকা ও সহজে ধোয়া যায় এমন পর্দা দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
দেয়ালের ক্যানভাসে আভিজাত্য
কোরবানির ঈদে ঘরে একটা ঐতিহ্যবাহী আবহ ধরে রাখতে পারলে বেশ ভালো লাগে। বসার ঘরের দেয়ালে কোনো দাগ থাকলে তা ঢাকতে বা একঘেয়েমি দূর করতে টু-ডি বা থ্রি-ডি ওয়াল স্টিকার ব্যবহার করতে পারেন। তবে এই ঈদে ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি বা নান্দনিক বাণী সংবলিত ফ্রেম দেয়ালে ঝুলিয়ে দিলে উৎসবের আমেজটা শতভাগ ফুটে ওঠে। দেয়ালের দাগ ঢাকতে ঐতিহ্যবাহী ওয়াল মেটের ব্যবহারও বেশ রুচিশীল দেখাবে।
আলোর ছোঁয়ায় রাতের উৎসব
কোরবানির ঈদে সারা দিনের খাটুনি শেষে আসল উৎসবের আমেজটা জমে ওঠে রাতে, যখন আত্মীয়-স্বজনরা এসে গল্পে মেতে ওঠেন। রাতের এই আবহাওয়াকে জাদুকরী করতে ঘরের সাধারণ সাদা লাইটের পরিবর্তে ‘ওয়ার্ম বা হলুদাভ’ আলোর ব্যবহার করুন। বসার ঘরের বা বেডরুমের দেয়ালের বর্ডারে এলইডি স্ট্রিপ লাইট লাগাতে পারেন। বিছানার দুই পাশে বা ঘরের কোনো কোণে সুন্দর শেডের টেবিল ল্যাম্প রাখলে পরিবেশটা বেশ শান্ত ও আরামদায়ক মনে হয়।
আরামদায়ক ও দাগ-প্রতিরোধী বিছানার চাদর
যেহেতু কোরবানির ঈদে মেহমানরা ঘরোয়া আড্ডায় বসেন, তাই বিছানার চাদর নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাপড়ের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি। ঘরে যদি বাচ্চা-কাচ্চা বেশি আসে বা ময়লা হওয়ার ভয় থাকে, তবে এই ঈদের জন্য একটু গাঢ় বা ডার্ক শেডের চাদর বেছে নেওয়া ভালো, এতে হুট করে কোনো দাগ লাগলে তা সহজে বোঝা যায় না। আর যদি ড্রয়িং রুম আলাদা থাকে, তবে বেডরুমে চোখের শান্তির জন্য হালকা রঙের সুতি বা বাটিকের চাদর ব্যবহার করতে পারেন।
আকর্ষণের মূল কেন্দ্র : রাজকীয় ডাইনিং টেবিল
কোরবানির ঈদ মানেই ভরপুর খাবার-দাবার, মাংসের হরেক রকম পদ আর দাওয়াতের ধুম। তাই এই ঈদে খাবার টেবিলের সাজ পায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব। রেগুলার টেবিল ক্লথের পরিবর্তে এবার ঈদে একটি জমকালো বা নতুন টেবিল ক্লথ বিছিয়ে দিন। এর ওপর গাঢ় বা উজ্জ্বল রঙের রানার এবং ম্যাট ব্যবহার করলে খাবারের আয়োজন আরও আকর্ষণীয় দেখাবে। সম্ভব হলে ডাইনিং টেবিলের ঠিক ওপরে একটি সুন্দর হ্যাঙ্গিং লাইট বা ছোট ঝাড়বাতি ঝুলিয়ে দিতে পারেন, যা রাতের ডিনারের পরিবেশকে একদম রাজকীয় করে তুলবে।
প্রকৃতির ছোঁয়া এবং তাজা ফুলের ম্যাজিক
কোরবানির ঈদের কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি দূর করতে সবুজের চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না। বসার ঘরের সেন্ট্রাল টেবিলে একটি ফুলদানিতে কিছু তাজা রজনীগন্ধা, গোলাপ বা জারবেরা সাজিয়ে রাখুন। ফুলের সুবাস মাংসের গন্ধ দূর করতেও সাহায্য করবে।
শৌখিন সামগ্রী ও মেঝের আভিজাত্য
মেঝের খালি ভাব দূর করতে এবং ঘরে একটি রাজকীয় লুক আনতে বসার ঘরে সোফার নিচে বা খাটের পাশে সুন্দর ডিজাইনের কার্পেট বা হাতের কাজের ছোট রাগস বিছিয়ে দিন। ঘরের কোনো খালি কোণে আপনার পছন্দের কিছু মাটির পাত্র, শোপিস বা সুন্দর মলাটের বই সাজিয়ে রাখুন। সম্ভব হলে একটি ছোট রঙিন মাছের অ্যাকুরিয়াম রাখতে পারেন, যা উৎসবে আসা ছোটদের যেমন ব্যস্ত রাখবে, তেমনি বড়দের মনও ভালো করে দেবে।
কোরবানির ঈদে ঘর সাজানোর মূল মন্ত্রই হলোÑপরিচ্ছন্নতা, সঠিক সুগন্ধি এবং ডাইনিং টেবিলের পরিপাটি উপস্থাপন। খুব বেশি জাঁকজমক না করেও আপনার নিজস্ব রুচি ও সামান্য সৃজনশীলতার মিশ্রণই আপনার চিরচেনা ঘরটিকে করে তুলতে পারে অনন্য ও উৎসবমুখর। ত্যাগের এই উৎসব আপনার ও আপনার পরিবারের সবার জন্য আনন্দময় ও বরকতময় হোক।

