সারা দেশে বর্তমানে বইছে স্মরণকালের অন্যতম তীব্র তাপপ্রবাহ। প্রখর রোদ, ভ্যাপসা গরম আর চরম আর্দ্রতায় জনজীবন যখন অতিষ্ঠ, ঠিক তখনই আমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। উৎসব মানেই বাঁধভাঙা আনন্দ, আপনজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়া এবং সুস্বাদু সব খাবারের বিপুল আয়োজন। তবে একদিকে খরতাপে শরীর সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, অন্যদিকে কোরবানির ঈদে স্বভাবতই অতিরিক্ত মাংস ও চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়া হয়। এই দুইয়ের মেলবন্ধনে স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে চিকিৎসকেরা বারবার সতর্ক করছেন। তাই উৎসবের আনন্দ যেন বিষাদে রূপ না নেয়, সেদিকে খেয়াল রেখে প্রতিটি বয়সের মানুষের জন্যই খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, এই তাপপ্রবাহের মধ্যে শরীরের বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে প্রচুর তরল পানের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু কোরবানির উৎসবের ডামাডোলে আমরা প্রায়ই পানি পানের কথা ভুলে যাই এবং গুরুপাক খাবারের দিকে অতিরিক্ত মাত্রায় ঝুঁকে পড়ি। এই ভুল খাদ্যাভ্যাস আমাদের পরিপাকতন্ত্রের ওপর দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি করে এবং শরীরকে ভেতর থেকে আরও বেশি উত্তপ্ত করে তোলে।
কোরবানির ঈদের প্রধান অনুষঙ্গই হলোÑ গরু, খাসি বা উটের লাল মাংস (রেড মিট)। এ ধরনের মাংসে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাট ও কোলেস্টেরল থাকে, যা হজম করতে পাকস্থলীকে দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। বিজ্ঞানসম্মতভাবে, প্রোটিন হজম হওয়ার সময় শরীরে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘থার্মোজেনিক ইফেক্ট’ বলা হয়। সুতরাং, তীব্র গরমে এ ধরনের রিচ ফুড বা গুরুপাক খাবার অসংযত মাত্রায় গ্রহণ করা যেকোনো সুস্থ মানুষের জন্যই চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
আবার পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই তাপপ্রবাহ এবং গুরুপাক খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি মারাত্মক হতে পারে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও হজমশক্তি বড়দের তুলনায় দুর্বল হওয়ায় তারা খুব সহজেই ডায়রিয়া, আমাশয় বা খাদ্যে বিষক্রিয়ায় (ফুড পয়জনিং) আক্রান্ত হতে পারে। অন্যদিকে, বয়স্কদের অনেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্?রোগ বা কিডনির জটিলতায় ভুগে থাকেন। চিকিৎসকদের কড়া নির্দেশ হলোÑ এই দুই বয়সি মানুষকে কোনোভাবেই অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত বা মসলাদার মাংস খেতে দেওয়া যাবে না। বয়স্কদের জন্য মাংসের চর্বিহীন অংশটুকু বেছে নিয়ে কম মসলায় রান্না করে পরিমিত পরিমাণে পরিবেশন করতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রেও মাংসের পাশাপাশি পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাদের পরিপাকতন্ত্র সুস্থ থাকে এবং তীব্র গরমে তারা অসুস্থ বা ক্লান্ত হয়ে না পড়ে।
ঈদের দিন শুধু মাংস না খেয়ে খাবারের তালিকায় প্রচুর পরিমাণে শসা, গাজর, টমেটো, কাঁচা পেঁপে ও লেটুস পাতা দিয়ে তৈরি তাজা সালাদ রাখা প্রয়োজন। এই সালাদ মাংসের চর্বি হজমে সহায়তা করবে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করবে। পাশাপাশি শরীরকে আর্দ্র রাখতে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, খাওয়ার স্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা চিনি ছাড়া তাজা ফলের রস পান করা অত্যাবশ্যক। রান্নার পদ্ধতি এবং খাবার সংরক্ষণের বিষয়েও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এই তীব্র গরমে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি দ্রুত হয় বলে খাবার খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যায়। তাই রান্না করা মাংস বা অন্যান্য খাবার দীর্ঘক্ষণ সাধারণ তাপমাত্রায় বাইরে ফেলে রাখা যাবে না, অবশ্যই ফ্রিজে বা সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। মাংস রান্নার ক্ষেত্রে ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত কষানোর পরিবর্তে সিদ্ধ করা, গ্রিল করা বা বেক করার পদ্ধতি বেছে নিলে ক্যালরি ও চর্বি গ্রহণের মাত্রা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সর্বোপরি, উৎসবের আনন্দকে পরিপূর্ণ করতে হলে আমাদের রসনার তৃপ্তির পাশাপাশি শরীরের সুস্থতার দিকেও সমান মনোযোগ দিতে হবে। চিকিৎসকদের দেওয়া দিকনির্দেশনাগুলো মেনে চলে খাদ্যাভ্যাসে পরিমিতিবোধ ও সচেতনতা বজায় রাখলেই কেবল এ তাপপ্রবাহের মাঝেও আমরা একটি নিরাপদ, আনন্দদায়ক ও স্বাস্থ্যকর ঈদুল আজহা উদযাপন করতে সক্ষম হব।

