ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর দিন থেকে স্মার্টফোনের দাম বাড়িয়েছে আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে হ্যান্ডসেট আমদানি ও সংযোজনকারী তথা মুঠোফোনের অফিসিয়াল ব্যবসায়ীরা। এমনকি সম্প্রতি তৈরি মুঠোফোনের আমদানি এবং সংযোজনে কাঁচামাল হিসেবে যন্ত্রাংশ আমদানিতেও শুল্ক কমানোর পরেও দাম বাড়াল স্মার্টফোনের। মডেলভেদে প্রতি হ্যান্ডসেটে সর্বনি¤œ ৫০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বর্ধিত মূল্যে গত ১ জানুয়ারি থেকে স্মার্টফোন বিক্রি হচ্ছে অফিসিয়াল দোকানগুলোতে। ১ জানুয়ারি থেকে মূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট তৈরিতে গত মাসে ব্র্যান্ডগুলোর বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরিরও অভিযোগ উঠেছে। বৈশ্বিক বাজারে হ্যান্ডসেট এবং হ্যান্ডসেটের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বাজারেও মূল্য বৃদ্ধির সাফাই দিয়েছে ব্র্যান্ডগুলো। তবে গ্রাহকরা বলছেন, বিতর্কিত এনইআইআর বিতর্কে আন-অফিসিয়াল হ্যান্ডসেট বিক্রির দোকান বন্ধ থাকার সুযোগ নিয়েছে অফিসিয়াল ব্র্যান্ডগুলো।
এনইআইআর-এ সংস্কারের দাবিতে দেশজুড়ে দোকান বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন আন-অফিসিয়াল স্মার্টফোনের ব্যবসায়ীরা। তবে অফিসিয়াল স্মার্টফোন এবং মোবাইল হ্যান্ডসেটের নিজস্ব ব্র্যান্ডশপগুলো খোলা রয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতানে এসব দোকান ঘুরে স্মার্টফোনের মূল্য বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। দেখা যায়, ভিভো, শাওমির ব্র্যান্ড রেডমি, ইনফিনিক্স এবং রিয়েল মি, ওয়ান প্লাস, স্যামসাং গ্যালাক্সি; নিজেদের বিভিন্ন মডেলের মূল্য বৃদ্ধি করেছে।
এ ছাড়াও টেকনোসহ আরও কিছু ব্র্যান্ডের মূল্য শিগগিরই বাড়বে বলে জানান মোবাইল বিক্রেতারা। অথচ গত ১ জানুয়ারিই স্মার্টফোনের ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় উপদেষ্টা পরিষদ। সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় মুঠোফোন আমদানি ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪৩ শতাংশে আনার সিদ্ধান্তের কথা জানায় সরকার। পাশাপাশি দেশে স্মার্টফোন সংযোজনে কাঁচামাল হিসেবে যন্ত্রাংশ আমদানিতেও শুল্ক কমানো হবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। এমন অবস্থায় স্মার্টফোনের দাম হ্রাস পাবে বলে গ্রাহকদের প্রত্যাশা থাকলেও, বাস্তবে ঘটেছে উলটো।
গ্রাহক বা খুচরা পর্যায়ে বর্ধিত মূল্যে স্মার্টফোন বিক্রির জন্য ব্র্যান্ডগুলোর পাইকারি পর্যায়ের সরবরাহকারী তথা ডিস্ট্রিবিউটরদের পক্ষ থেকে সাধারণ বিক্রেতাদের কাছে দেওয়া নতুন মূল্যতালিকার কপি রয়েছে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের কাছে। বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের বর্ধিত নতুন মূল্যতালিকা দিয়েছেন ডিস্ট্রিবিউটররা।
সেসব মূল্যতালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪ জিবি র্যাম এবং ৬৪ জিবি রমের (৪+৬৪) শাওমির রেডমি এ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ হাজার ৯৯৯ টাকায় সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে (এমআরপি) বিক্রি হয়েছে। ডিস্ট্রিবিউটরদের থেকে খুচরা বিক্রেতারা এই মডেলটি সংগ্রহ করতেন ১০ হাজার ৪২০ টাকায়। অর্থাৎ ডিস্ট্রিবিউটরদের জন্য মার্জিন ছিল ৫৭৯ টাকা। কিন্তু গত ১ জানুয়ারি থেকে বিক্রির জন্য বিক্রেতাদের দেওয়া শাওমির ডিস্ট্রিবিউটর ‘এস এইচ টেলিকম’-এর বর্ধিত মূল্যতালিকায় দেখা যায়, ডিভাইসটি সংগ্রহ করতে হবে ১১ হাজার ৯৭৫ টাকায় এবং গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা যাবে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৯৯৯ টাকায়।
অর্থাৎ বিক্রেতাদের মার্জিন বেড়েছে এক হাজার ২৪ টাকা কিন্তু গ্রাহককে এই ডিভাইস কিনতে হবে দুই হাজার টাকা বেশি মূল্যে। একইভাবে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত রেডমি নোট ১৪ প্রো ৪জি (৮/২৫৬)-এর মূল্য ছিল ২৮ হাজার টাকা কিন্তু বর্তমানে সেটির মূল্য ৩৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ দাম বেড়েছে পাঁচ হাজার টাকা। ভিভো ব্র্যান্ডের অনুমোদিত ডিলার ‘মোবাইল জোন’ ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর নতুন মূল্যতালিকা দিয়েছে বিক্রেতাদের।
সেই তালিকা অনুযায়ী, ভিভোর ‘ওয়াই২১ডি (৮/১২৮)’ মডেলের হ্যান্ডসেটটির মূল্য ২১ হাজার থেকে দুই হাজার টাকা বাড়িয়ে ২৩ হাজার করা হয়েছে। ভিভো ব্র্যান্ডের অন্তত আরও চারটি মডেলের মূল্য এক থেকে দুই হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। ইনফিনিক্স ব্র্যান্ডের ‘স্মার্ট ১০ (৪/৬৪)’ মডেলের ডিভাইসটি গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছিল ১১ হাজার টাকায়। কিন্তু ১ জানুয়ারি থেকে এটি বিক্রি হচ্ছে ১২ হাজারে। হট৬০আই (৬/১২৮) মডেলের পূর্বমূল্য ১৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১৬ হাজার করা হয়েছে। একই মডেলের ৮/২৫৬ জিবি ভ্যারিয়েন্টের মূল্য বেড়েছে দুই হাজার টাকা। আরেক ব্র্যান্ড রিয়েল মিও তাদের হ্যান্ডসেটের মূল্য গড়ে এক হাজার টাকা করে বাড়িয়েছে।
নোট ৭০ (৬/১২৮) মডেলের স্মার্টফোনের পূর্বমূল্য ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকায় বাড়ানো হয়েছে। রিয়েল মি ‘সি৮৫প্রো ৬/১২৮)’ মডেলটির মূল্য ২১ হাজার থেকে দুই হাজার টাকা বাড়িয়ে ২৩ হাজার করা হয়েছে। পিছিয়ে নেই স্যামসাং ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনগুলোও। বাংলাদেশে এই ডিভাইসটি বর্তমানে আমদানি এবং কিছু মডেল সংযোজন করে এক্সেল টেলিকম। স্যামসাং ‘গ্যালাক্সি এ২৬ ৫জি (৮/১২৮) মডেলটির পূর্বমূল্য ছিল ৩৪ হাজার টাকা। তবে গত ১ জানুয়ারি থেকে এটি বিক্রি হচ্ছে ৩৮ হাজার টাকায়। অর্থাৎ ডিভাইসটির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে চার হাজার টাকা। স্যামসংয়ের অন্তত দুই ডজন মডেলের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে একটি মডেলের দাম কমালেও নিজেদের আরও চারটি মডেলের দাম বাড়িয়েছে ওয়ান প্লাস।
সরবরাহকারীদের পাঠানো নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী স্মার্টফোন বিক্রি করতে দেখা যায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের। রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরের শাহ আলী প্লাজার তৃতীয় তলায় ইনফিনিক্সের অফিসিয়াল স্টোর ‘কাজী স্টোর’। এই দোকানে ইনফিনিক্সের ‘স্মার্ট ১০ (৪/৬৪)’ মডেলের স্মার্টফোন বিক্রি হচ্ছে ১১ হাজার ৫০০ টাকায়। আগে এর মূল্য এক হাজার টাকা কম ছিল।
১ জানুয়ারি থেকেই যে ইনফিনিক্সের বিভিন্ন মডেলের দাম বেড়েছে, বিষয়টি অকপটেই স্বীকার করেছেন দোকানে দায়িত্বরত বিক্রয় প্রতিনিধি। পাশেই ‘মোবাইল বাজার’ নামক আরেকটি দোকান শাওমির অফিসিয়াল হ্যান্ডসেট বিক্রি করে। সেখানে গিয়ে রেডমি ১৫ (৬/১২৮)-এর মূল্য ১৯ হাজার টাকা জানা যায়। এখানকার বিক্রয় প্রতিনিধিরা অকপটেই জানান, ডিভাইসটির মূল্য ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮ হাজার টাকা ছিল। একই মার্কেটে অফিসিয়াল রিয়েল মি হ্যান্ডসেট বিক্রয়কারী ‘ডিপিবিএল’র শো-রুমেও স্মার্টফোনের বাড়তি দাম দেখা যায়।
এখানকার একজন স্মার্টফোন বিক্রেতা পরিচয় গোপের শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘মোবাইল ফোনের যে দাম বাড়ানো হবে সেটা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই বুঝেছিলাম। কারণ তখন ব্র্যান্ডগুলো স্মার্টফোন সরবরাহ প্রায় বন্ধ রেখেছিল। আমরা মোবাইল চাইলেও তারা দিত না। বলত যে, স্টকে মোবাইল নেই। তখনই মূল্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত পেয়েছিলাম। তারপর ৩০ ডিসেম্বরের দিকে ডিস্ট্রিবিউটররা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নতুন মূল্যতালিকা দিতে শুরু করে।’ দোকানে থাকা স্মার্টফোন কখন এসেছে এমন প্রশ্নের জবাবে ওই বিক্রেতা বলেন, ‘কিছু স্মার্টফোন আগেই ছিল, তবে সেটার পরিমাণ খুবই স্বল্প। এই কারণে কিছু ডিভাইস বিক্রেতা চাইলে এখনো কমে দিতে পারেন। তবে বেশির ভাগ স্টক এসেছে মূল্য বৃদ্ধির পর।’
এদিকে এনইআইআর সমর্থন করে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিলাসবহুল এক হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে অফিসিয়াল হ্যান্ডসেট আমদানিকারক ও সংযোজনকারীদের সংগঠন ‘এমআইওবি’। এ সময় মুঠোফোনের মূল্য বৃদ্ধি সম্পর্কে জানতে চাইলে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, ‘বিশ^ব্যাপী ফোন ও মেমোরির দাম বেড়েছে; এনইআইআর চালু হওয়ার কারণে দাম বেড়েছে বলে ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।’ মূল্যবৃদ্ধির একই অজুহাত দেন অন্যরাও।
রেডমির মূল ব্র্যান্ড শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড জিয়াউদ্দিন চৌধুরী ও এমআইওবি সদস্য রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, “শাওমির ফোনের দাম এনইআইআর চালু হওয়ার তারিখ অর্থাৎ ১ জানুয়ারির আগেই বাড়ানো হয়েছে এবং এই মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো মেমোরি চিপ; বিশেষ করে ‘ডির্যাম’ এবং ‘এনএএনডি ফ্ল্যাশ’ বৈশি^ক সংকট ও মূল্য বৃদ্ধি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং বড় বড় কোম্পানির ডাটা সেন্টারগুলোর জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ডির্যাম এবং এনএএনডি ফ্ল্যাশের দাম এরই মধ্যেই ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মেমোরি চিপ সংকট ও মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব যে স্মার্টফোনের দামে পড়বে, সে বিষয়ে শাওমির প্রেসিডেন্ট ২০২৬ সালের জন্য আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। ফলে এই মূল্য বৃদ্ধি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি অনেক আগেই পূর্বাভাস করা হয়েছিল এবং সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।”
স্টকে থাকা হ্যান্ডসেট বিক্রি শেষ হওয়ার পর নতুন ডিভাইসের ক্ষেত্রেই বর্ধিত মূল্য সমন্বয়েরও দাবি করেছেন জিয়াউদ্দিন।
তবে অফিসিয়াল ব্যবসায়ীদের এই মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এনইআইআর প্রসঙ্গে যখন আন-অফিসিয়াল ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রেখেছেন, ঠিক তখনই দাম বাড়িয়েছেন অফিসিয়াল ব্যবসায়ীরা। সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে তারা স্রেফ প্রতারণা করলেন। সুযোগের সর্বোচ্চ সুবিধা নিতেই তারা দাম বাড়িয়েছেন। আর শুল্ক কমানোর ঘোষণা সরকার দিলেও, রাজস্ব বোর্ডকে কোনো প্রজ্ঞাপন দিতে দেখেছেন? দেখেননি। সরকার এবং ব্যবসায়ীরা মিলে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করলেন। মূল্য বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হলো। যার এখন মোবাইল দরকার, বাড়তি দামে কেনা ছাড়া তার কাছে আর কোনো উপায় নাই।’
অফিসিয়াল আমদানিকারকদের স্মার্টফোনের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দায়িত্বশীল কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এনইআইআর চালু হলে অফিসিয়াল আমদানিকারকরা স্মার্টফোনের দাম বাড়াবে না বরং বাজারে দাম কমবে; বিভিন্ন সময় এমন দাবি ছিল বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেনের। কিন্তু এনইআইআর চালুর দিনই অফিসিয়াল ব্যবসায়ীদের স্মার্টফোনের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে মঙ্গলবার দিনভর যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে তার দাপ্তরিক নম্বরে বার্তা পাঠিয়েও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার দিক থেকে কোনো সাড়া আসেনি। কয়েক দফা চেষ্টা করেও কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারীর সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়নি।

