আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রোহিঙ্গাদের বসবাসের অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম জেলার সীতাকু- থানার জঙ্গল সলিমপুর। নগরীর ওয়ার্ড কমিশনার থেকে ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে জাতীয় পরিচয়পত্র বানিয়ে রোহিঙ্গাদের বানানো হয় বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের দিয়ে সন্ত্রাসী আস্তানা গড়ে তোলা হয় জঙ্গল সলিমপুরে।
এই এলাকার পাহাড়ে সেনাবাহিনী সক্রিয় থাকায় সন্ত্রাসীদের কর্মকা- বেশ সীমিত। কিন্তু ভিন্ন চিত্র সমতলের জঙ্গল সলিমপুরের। এখানে অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে বারবার নিজেদের অবস্থান জানান দিয়ে চলেছে সন্ত্রাসীরা। কিন্তু গত ১৫-১৬ বছরে তাদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। যে কারণে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গাদের এই আবাসস্থল।
অভিযোগ রয়েছে, সলিমপুরের প্রবেশপথে রোটেশন অনুযায়ী পাহারা দেন অর্ধশত পাহারাদার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ছাড়াও অপরিচিত কেউ ওই এলাকায় ঢুকলেই খবর চলে যায় অন্যদের কাছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে ২০২২ সালের ২ আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের লোকজনকে বাধা দেওয়া হয়। ওই বছর ৮ সেপ্টেম্বর আলীনগরে অবৈধ বসতি উচ্ছেদে গেলে সেখানে পুলিশের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এমনভাবে একাধিকবার র্যাব ও পুলিশের ওপর হামলা চালায় রাজনৈতিক মদদপুষ্ট সলিমপুরের রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।
২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে প্রশাসনের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। ওই ঘটনায় দায়িত্বরত তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর ফারুক এবং সীতাকু- থানার ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর পাহাড় কাটার সংবাদ সংগ্রহে গেলে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলা চালায় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। সে সময় আহত হন দুই সাংবাদিক।
সর্বশেষ গত ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন র্যাব সেভেনের আভিযানিক দল। র্যাব সদস্যদের জিম্মি করে একটি কক্ষে আটকে রেখে মারধর করে সন্ত্রাসীরা। পরে র্যাবের পিস্তল কেড়ে নিয়ে তাদের ওপর গুলি চালায়। এ সময় সুবেদার মোতালেব ছাড়াও তিনজন গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া র্যাবের তিন সদস্যকে অপহরণ করে জিম্মি করা হয়। পরে ওই দিন রাতেই অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে র্যাব। আহত র্যাব সদস্যদের সিএমএইচ নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে সুবেদার মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসক। বাকিদের চিকিৎসার জন্য ভর্তি করানো হয়।
এই ঘটনাকে র্যাবের ওপর পরিকল্পিত হামলা বলে উল্লেখ করেছেন র্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান। তিনি বলেন, সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে যৌথ অভিযান চালিয়ে সলিমপুরের সন্ত্রাসীদের আস্তানা আমরা গুঁড়িয়ে দেব।
জেলা পুলিশের তথ্য মতে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদদে জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে বড় বড় দুটি আবাসিক এলাকা। একটি হয়েছে ছিন্নমূল বস্তিবাসীর নামে, অন্যটি আলীনগর। তথ্য সূত্র বলছে, ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন ৩৪টি পাহাড় কেটে প্রায় ৬০০ একর জমি দখল করে সেখানে আবাসিক এলাকার জন্য প্রায় ১৪ হাজার প্লট তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘আলীনগর সমবায় সমিতি লিমিটেডে’র নামে পাহাড় কাটা হয়েছে ৩টি এবং ২৩৬ একর জমি অবৈধভাবে দখল করে আড়াই হাজার প্লট তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকায় বসবাসরত অধিকাংশ বাসিন্দা রোহিঙ্গা। রাজনৈতিকভাবে মদদপুষ্ট হয়ে আওয়ামী লীগের সময়ে তারা এই জায়গাগুলোতে আস্তানা গড়ে তুলেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুসারে, একসময় এ এলাকার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন আলী আক্কাস নামে এক ভূমিদস্যু। ২০১০ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারে আলী আক্কাস নিহত হওয়ার পর এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন তার অনুসারীর। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার জসিম এবং সীতাকু-ের আওয়ামী লীগ নেতা মামুনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বছরের পর বছর ধরে দখল হয়েছে সলিমপুরের পাহাড়ি অঞ্চল। এই সলিমপুরের অপরাধ রাজত্বের একপক্ষের নিয়ন্ত্রক সন্ত্রাসী ইয়াসিন মিয়া এবং অপর পক্ষের কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক। জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে ওঠা নিষিদ্ধ বসতি এলাকায় প্রবেশ করতে হলে প্রয়োজন হয় বিশেষ পরিচয়পত্রের। পরিচয়পত্র ছাড়া ঢুকতে পারেনি কেউ। এমনকি পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রবেশ করতে হলে আগেভাগে সংবাদ জানাতে হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন