ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

শেখ হাসিনা যুগের সমাপ্তি? জয় বললেন, ‘সম্ভবত তাই’

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০২:১৫ এএম
রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

আওয়ামী লীগ যদি বাংলাদেশে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আর নেতৃত্বে না-ও দেখা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কথায়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমার মা আসলে দেশে ফিরতে চান। তিনি অবসর নিতে চান। তিনি বিদেশে থাকতে চান না।’

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন জয়ের মা, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে মৃত্যুদ- দিয়েছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে এই দল আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।

আওয়ামী লীগের অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা শেখ হাসিনার মতোই দেশের বাইরে আত্মগোপনে রয়েছেন। দেশে যারা ছিলেন, তাদের অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে আছেন কারাগারে। শেখ হাসিনার ছেলে জয় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ওয়াশিংটন ডিসিতে তার বাড়িতে গিয়ে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি না। উত্তরে শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘অবশ্যই আছে। আওয়ামী লীগ কোথাও যাচ্ছে না। এটা সবচেয়ে প্রাচীন ও বড় দল। আমাদের ৪০-৫০ শতাংশ ভোট আছে। আপনি কি মনে করেন, ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ হঠাৎ সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দেবে? দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৬-৭ কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের। তারা কি হঠাৎ সমর্থন বন্ধ করে দেবে?’

শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, ‘আমি জিজ্ঞেস করছি কারণ আপনি বলেছেন, আপনার মা রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভাবছেন। এখন যদি তিনি কখনো বাংলাদেশে ফিরে যান, তিনি কি আর রাজনীতিতে থাকবেন না?’ জয় উত্তরে বলেন, ‘না, তার বয়স হয়েছে (৭৮ বছর)। এমনিতেই এটা তার শেষ মেয়াদ হতো। তিনি অবসর নিতে চাচ্ছেন।’ শ্রীনিবাসন জৈন তখন প্রশ্ন করেন, তাহলে এটাকে কি ‘হাসিনা যুগের সমাপ্তি’ বলা যায়? শেখ হাসিনার ছেলে সজীব জয় বলেন, ‘সম্ভবত তাই।’ আল জাজিরার সাংবাদিক আবারও প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে আপনি বলছেন যে আওয়ামী লীগ যদি আবার বাংলাদেশে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, তাকে (শেখ হাসিনা) ছাড়াই সেটা হবে?’

জয় বলেন, ‘হ্যাঁ। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। এটা সবচেয়ে পুরোনো দল। ৭০ বছর ধরে আছে। তাকে (শেখ হাসিনা) সঙ্গে নিয়ে অথবা তাকে ছাড়াই এ দল চলবে। কেউ তো চিরদিন বাঁচে না।’

‘নিয়তির পরিহাস’: শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের অধীনে ১৫ বছরে যে তিনটি নির্বাচন হয়েছে, তার সবগুলোই নানা অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সে সময় জামায়াতে ইসলামী ছিল নিষিদ্ধ। আর এখন আওয়ামী লীগের কার্যকম নিষিদ্ধ, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তারা অংশ নিতে পারছে না। সে প্রসঙ্গ ধরে শ্রীনিবাসন জৈন প্রশ্ন করেন, ‘আপনি একমত হবেন, সার্বিকভাবে রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ একটি বাজে ধারণা। বহু মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাও তা-ই বলে। কিন্তু এখানে কি একধরনের আয়রনি নেই? আপনি যখন কারচুপির নির্বাচন ও অনিয়মের অভিযোগ করেন, ঠিক সেই অভিযোগ তো বছরের পর বছর ধরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে।’

ওই অভিযোগ থাকার কথা মেনে নিয়েই জয় তার উত্তরে বলেন, আওয়ামী লীগ ‘কখনো কাউকে’ নিষিদ্ধ করেনি। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল আদালতের সিদ্ধান্তে। আওয়ামী লীগের সময়ের নির্বাচনগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আর জাতিসংঘের সমালোচনার বিষয়গুলো সামনে আনলে সজীব ওয়াজেদ জয় ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের জরিপের কথা তোলেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের জরিপ, আমেরিকানদের জনমত জরিপ- সবই দেখাচ্ছিল আওয়ামী লীগ বিপুল ব্যবধানে জয়ী হবে। আমাদের কারও কোনো অনিয়মের প্রয়োজন ছিল না। প্রশাসনের ভেতরে কিছু লোক নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে এসব করেছে। দলীয় দিক থেকে আমার মা ও আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। আমরা একটি পরিচ্ছন্ন নির্বাচন চেয়েছিলাম, কারণ আমরা যেকোনোভাবেই জিততে যাচ্ছিলাম। আমাদের জনমত জরিপ, আমি নিজেই আমাদের দলের জন্য জরিপ পরিচালনা করি- আমরা ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জরিপ করেছিলাম, যেগুলো ছিল মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। ওই ১৬০টি আসনে আমাদের সর্বনিম্ন জয়ের ব্যবধান ছিল ৩০ শতাংশ। তাই কোনোভাবেই এর প্রয়োজন ছিল না।’ জয় দাবি করেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে কোনো ‘কারচুপি হয়নি’। বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটা ‘দুর্ভাগ্যজনক’।

সহিংসতার ‘হুমকি’ ও ওসমান হাদি হত্যা : সজীব ওয়াজেদ জয় এর আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন ‘হতে দেওয়া হবে না’। সরকার যদি দমন-পীড়ন চালায়, তাহলে তা ‘সহিংসতার দিকে যাবে’। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে শ্রীনিবাসন জৈন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার একটি কারণ হিসেবে সরকার বলছে, আপনারা এসব নির্বাচনে সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছেন। আর সেটি কি সত্য নয়? কারণ আপনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন।’

জবাবে হাসিনাপুত্র জয় বলেন, ‘দেখুন, যখন কাউকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলা হয়, তখন আর কী কী হবে? আমরা সহিংসতা চাই না। আমাদের তো প্রতিবাদ করতেও দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ কি সহিংসতা করছে?’ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের ওপর নিপীড়নের পাল্টা অভিযোগ এনে জয় বলেন, ‘গত বছরের জুলাইয়ের আন্দোলনের পর থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের শত শত কর্মী নিহত হয়েছেন। ত্রিশের বেশি মানুষ নিরাপত্তা হেফাজতে মারা গেছেন। মাত্র গত সপ্তাহেই আমাদের দলের এক সংখ্যালঘু নেতা, একজন হিন্দু ভদ্রলোক, কারাগারে হেফাজতে নিহত হয়েছেন।’

‘আপনি বলছেন, ভুলকে ভুল দিয়ে ঠিক করা যায় না। আবারও বলছি, যখন কাউকে বলপ্রয়োগে দমন করা হয়, কোনো বিকল্প না রাখা হয়, তখন কী হবে?’

শ্রীনিবাসন জৈন তখন বলেন, ‘কিন্তু মি. ওয়াজেদ, আপনি কি মনে করেন না, এ ধরনের বক্তব্য (সহিংসতার পথে যাবে) ব্যবহার করে আপনি আসলে সেই ধারণাকেই সমর্থন করছেন যে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা উচিত? কারণ আপনি সহিংসতার এই হুমকিটা সামনে রাখছেন- আমাদের ভোট করতে দিন, নইলে।’ জয় উত্তরে বলেন, ‘আমি সহিংসতার হুমকি দিইনি। আমি বলেছি, আমাদের যদি সহিংসভাবে দমন করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সহিংসতা হবে। আমি আমার কর্মীদের হামলা করতে বলিনি।’

আল জাজিরার সাংবাদিক তখন ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনা এবং তাতে আওয়ামী লীগ কর্মীর জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, ‘এটা কি সত্যি? তার হত্যার পেছনে কি আওয়ামী লীগের হাত ছিল?’ সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘অবশ্যই না। দেখুন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে হত্যাকা- ঘটানোর মতো সক্ষমতা যদি আমাদের থাকত, তাহলে আপনি কি মনে করেন এই রেজিম (অন্তর্বর্তী সরকার) এখনো টিকে থাকত?’ শেখ হাসিনার ছেলে দাবি করেন, হাদি হত্যার পেছনে আওয়ামী লীগ নেই, এমন সহিংস লোকজন আওয়ামী লীগের ‘নেই’, হয়তো অন্য সংগঠনের থাকতে পারে।

ওসমান হাদিকে গুলি করার জন্য যাকে দায়ী করা হচ্ছে, সেই ফয়সাল করিম মাসুদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন বলে পুলিশের ভাষ্য। মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের কড়া সমালোচক ছিলেন হাদি, সে কারণেই তাকে হত্যা করা হয়, এটি ছিল ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধের’ ঘটনা। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জয় বলেন, ‘শুটার কে, তা আমি জানি না। এ বিষয়ে অনেক নাম সামনে এসেছে। তারা এমন অনেকের নাম বলেছে, যাদের এর সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। আমাদের ছাত্র সংগঠনের কথা যদি বলেন, বিশেষ করে আমরা যখন সরকারে ছিলাম, তখন এর সঙ্গে অসংখ্য তরুণ যুক্ত ছিল। সে (ফয়সাল) কি সত্যিই যুক্ত ছিল? কতটা যুক্ত ছিল? তার কি কোনো পদ ছিল? সবকিছুর দায় তারা আওয়ামী লীগের ওপর চাপাচ্ছে।’

শ্রীনিবাসন তখন বলেন, ‘কিন্তু এই ধারণা করা কি যুক্তিসংগত নয় মি. ওয়াজেদ? কারণ একদিকে আপনি সহিংসতার সম্ভাবনা, সহিংসতার হুমকির কথা বলছেন, অন্যদিকে বাস্তবেই একটি সহিংস ঘটনা ঘটেছে।’ জয় তখন বলেন, তার সহিংসতার কথা এসেছে ‘প্রতিবাদ থেকে’।

জুলাই হত্যাকাণ্ড : হাসিনাপুত্র জয়ের কাছে শ্রীনিবাসন জানতে চান, চব্বিশের অভ্যুত্থান দমানোর ‘নির্মম’ চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়। এসবের জন্য কোনো অনুশোচনা আছে কি না। জবাবে শেখ হাসিনার ছেলে বলেন, ‘সেটা সত্য নয়। আপনি যদি অনলাইনে আমার বক্তব্য শুনে থাকেন, দেখবেন আমি বারবার বলেছিÑ আওয়ামী লীগ ঠিকমতো বিক্ষোভ সামলাতে পারেনি। আমাদের সরকার মিসহ্যান্ডেল করেছে।’

আল জাজিরার সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, যেখানে ‘শেখ হাসিনার নির্দেশে’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শত শত নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে, সেখানে ‘মিসহ্যান্ডেলড’ শব্দটি কি অনেক বেশি নমনীয় নয়? সজীব ওয়াজেদ জয় দাবি করেন, এর কোনো কিছুই তার মায়ের নির্দেশে হয়নি। ‘আমার মা যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে চাইতেন, তাহলে তিনি এখনো ক্ষমতায় থাকতেন। ইরানে এখন যা ঘটছে, সেটাই দেখুন। তারা কি কিছু করতে পারছে? না।’