দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ভূমিকম্পের প্রবণতা। বিশেষ করে চলতি মাসেই অন্তত ১০ বার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এতে বিশেষজ্ঞরা যেমন চিন্তিত, তেমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দেশের মানুষ। গতকাল শুক্রবারও ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরা শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে আশাশুনি উপজেলায়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। খুলনা, যশোর ও রাজশাহী অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার খবর জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এদিকে বাংলাদেশের ভূমিকম্পে কেঁপেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাও। ভয়ে, আতঙ্কে বাড়ি, অফিস ছেড়ে অনেকে বাইরে বেরিয়ে যান। কয়েকটি পুরোনো বাড়ি হেলে পড়ার খবর মিলেছে। এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি সবশেষ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূকম্পন অনুভূত হয়। ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল মিয়ানমার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বড় ধরনের ভূমিকম্পের আগাম বার্তা। যেকোনো সময় বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে দেশে। তারা ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রকাশ করে ভূমিকম্পের বেশ কিছু উৎপত্তিস্থলও চিহ্নিত করেছেন। সেগুলো হলোÑ সিলেটের ডাউকি ও টাঙ্গাইলের মধুপুর। তাদের এই আশঙ্কার কদিন পরই নরসিংদীতে একটি নতুন পরিপক্ব ফল্টের হদিস মিলে। এই ফল্ট থেকে ছোট মাত্রার কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর পর থেকেই নরসিংদী নিয়ে নানা আলোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে বার বার ভূমিকম্পের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের পুর কৌশল বিভাগের অধ্যাপক বিশিষ্ট ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বারবার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
গতকালের ভূমিকম্পের বিষয়ে ড. আনসারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সাধারণত কোনো চ্যুতিরেখার মেয়াদ এক-দেড়শ বছর পার হয়ে গেলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। সেই হিসাবে মধুপুর ও সিলেটের চ্যুতিরেখা প্রায় ১২৫ বছর অতিক্রম করেছে। বলতে গেলে দুটি চ্যুতিরেখাই পরিপক্ব হয়ে গেছে অনেক আগেই। সবকিছুই আল্লাহপাকের হাতে, তবুও গণনা বলে, যেকোনো একটি চ্যুতিরেখা থেকে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের উৎপত্তি হতে পারেÑ রিখটার স্কেলে যার মাত্রা হবে ৭। তবে নরসিংদীর চ্যুতিরেখাটি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পরপরই দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে ঢাকাসহ সারা দেশে এই কম্পন অনুভূত হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে অনেক স্থানে সাধারণ মানুষ বাসাবাড়ি ও বহুতল ভবন থেকে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্রের (ইএমএসসি) তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। ভূপৃষ্ঠ থেকে কম্পনটির গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার, যার ফলে এর তীব্রতা বেশ অনুভূত হয়েছে। এর আগে গত বুধবার রাতে ৫.১ মাত্রার এবং গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ৪.৬ মাত্রার দুটি পৃথক ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল দেশ। ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে পর পর দুটি কম্পনের পর গতকাল জুমার পরপরই আবারও মাঝারি মাত্রার এই ভূমিকম্পে জনমনে বড় ধরনের দুর্যোগের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গতকালের এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে প্রায় ২৮০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ছাড়াও সিলেট, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে এই কম্পন অনুভূত হয়েছে। তবে উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরায় একটি কাঁচাঘর ধসে পড়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে দেশের কোথাও আর বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। চলতি মাসের প্রথম ২৭ দিনেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০ দফা ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। অধিকাংশ কম্পনের মাত্রা মৃদু থেকে মাঝারি হলেও জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ও ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের (ইএমএসসি) তথ্যমতে, এ মাসে ২৭ দিনেই ভূমিকম্প হয়েছে ১০ বার। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৪ মিনিট ৫ সেকেন্ডে আরেকটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশ। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৬ এবং উৎপত্তিস্থল ভারতের সিকিম অঞ্চলে, যা ঢাকা থেকে প্রায় ৪৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে।
বুধবারও রাত ১০টা ৫৪ মিনিটে মিয়ানমার উৎপত্তিস্থল থেকে সৃষ্ট ভূমিকম্প ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হয়। চলতি মাসের প্রথম দিনও ভূকম্পন অনুভূত হয়। সেদিন ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প হয়। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৩। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে। ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পরপর দুটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশের বিভিন্ন এলাকা। ওই দুই কম্পনের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২, যার উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার। একই দিন ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলাকেন্দ্রিক ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। এ ছাড়া ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় দুটি কম্পন অনুভূত হয় (মাত্রা ৩ দশমিক ৩ ও ৪)। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলাকেন্দ্রিক ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পও রেকর্ড করা হয়।
দেশে ভূমিকম্পের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আবহাওয়াবিদদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে প্রতিবছর গড়ে ৬ থেকে ৮টি ভূমিকম্প অনুভূত হলেও গত এক বছরেই ৩২ বার কেঁপে উঠেছে দেশ। ঘনঘন এই ভূকম্পন বড় ধরনের কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির নিচে ইউরেশিয়ান প্লেট ও ইন্ডিয়ান প্লেটের ক্রমাগত সংঘর্ষের কারণে প্রচুর পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় এই শক্তি জমা হয়ে আছে, যা বড় কোনো ভূমিকম্পের অশনিসংকেত দিচ্ছে। মূলত প্লেটগুলোর এই সংঘর্ষ ও ঘনঘন ছোট কম্পনগুলো একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন আবহাওয়াবিদরা।

