ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

‘বিএনপিপন্থি’ হয়ে ফিরতে চান ডা. জোনাইদ শফিক

শাওন সোলায়মান
প্রকাশিত: মার্চ ৭, ২০২৬, ১২:৩৩ এএম
ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

পেশায় চিকিৎসক হলেও বাংলাদেশের আর্থিক খাতের এক কলঙ্কিত নাম অধ্যাপক ডা. জোনাইদ শফিক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে জোনাইদ শফিকের শত শত কোটি টাকার আর্থিক অপরাধের তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। শুধু এক নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের নামে পুঁজিবাজার এবং ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে দুবাইতে বিলাসবহুল জীবনযাপন করা সেই জোনাইদ এখন নিজেকে ‘বিএনপিপন্থি’ চিকিৎসক পরিচয়ে দেশে ফিরতে চাইছেন। দ্রুত জামিনে বের হবেন এমন ‘সবুজ সংকেত’-এর অপেক্ষায় দেশে এসে আদালতে নিজেকে সোপর্দ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, সরকার এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ শফিকের হয়ে এরই মধ্যে তদবির করছেন।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আপন মামাতো ভাই এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের আপন খালাতো ভাই ডা. জোনাইদ শফিক। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শিবলি রুবাইয়াত এবং শেয়ার কারসাজির অন্যতম হোতা আবুল খায়ের হিরুরও ঘনিষ্ঠ ছিলেন জোনাইদ। এই দুজনের সঙ্গে যোগসূত্র করে আওয়ামী আমলে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, পিপলস ব্যাংক এবং ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো বিভিন্ন আর্থিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলে নিয়ে আওয়ামী অলিগার্কে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। এদের মধ্যে শিবলি রুবাইয়াত বর্তমানে কারাগারে আছেন এবং আবুল খায়ের হিরু পলাতক। 

একসময় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবিএল) চেয়ারম্যান ছিলেন সাইফুজ্জামানের স্ত্রী রুকমীলা জামান এবং পরিচালক ছিলেন জোনাইদ নিজে। মেডিকেল প্র্যাকটিসের আড়ালে ব্যাংকিং খাতের এই পরিচয় এবং দেশের প্রভাবশালী ব্যাবসায়িক গোষ্ঠীর স্বজন হিসেবে আওয়ামী আমলে দেশের আর্থিক খাত স্রেফ লুটেপুটে খেয়েছেন জোনাইদ। ইউসিবিএল থেকে ২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়েরকৃত মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি এখন ডা. জোনাইদ। এই মামলার অন্যান্য আসামির মধ্যে অন্যতম সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং তার স্ত্রী ও ইউসিবিএলের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান। নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থাকাকালীন দেশের পুঁজিবাজার এবং ব্যাংকিং খাত থেকে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি উঠিয়েছিলেন জোনাইদ। ৫ আগস্টের পর দুবাইয়ে পালিয়ে যাওয়ার পূর্বে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ৫৪০ কোটি টাকা ঋণ রেখে যান জোনাইদ।

এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হসপিটাল এবং জাপান-বাংলাদেশ রিটায়ারমেন্ট হোমেরও এমডি ডা. জোনাইদ। প্রতিষ্ঠান দুটির মূল উদ্যোক্তা ও চেয়ারম্যান অধ্যাপক সরদার এ নাঈমের অগোচরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১২০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছেন তিনি। একটি প্রকল্পের কার্যাদেশের বিপরীতে পরিচালক পদে থাকা নিজের ইউসিবিএলসহ অন্তত তিনটি ব্যাংক থেকে এই ঋণ নেন তিনি। এর মধ্যে এনআরবিসি থেকে নেওয়া ৭০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে অন্তত ১৯ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। অথচ কার্যাদেশের মূল কাজ সম্পন্ন না করেই লোনের সিংহভাগ অর্থ ব্যক্তিগত খাতে খরচ করেছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় বসবাসরত দুই মেয়ের কাছে প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন।

এ বিষয়ে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এবং জাপান-বাংলাদেশ রিটায়ারমেন্ট হোমের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সরদার এ নাঈম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে তার মাঝে অসততা দেখিনি। তিনি একজন ভালো চিকিৎসক; কিন্তু কতিপয় ব্যক্তির প্ররোচনায় আর্থিক খাতে জড়িয়ে ভিন্ন ধারায় চলে যান। আমরা সবাই সেই ব্যক্তিদের পরিচয় জানি।’

এমন অসংখ্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ডা. জোনাইদসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে দুদক। এমন দুটি মামলায় অপরাধের সঙ্গে শফিকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় আদালতে চার্জশিট জমা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন ওই দুই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে শফিকের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে জোনাইদ শফিক, তার স্ত্রী মাসুমা পারভীন এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটি (বিএফআইইউ)। এ ছাড়া আরও অন্তত ২৬টি মামলার তদন্ত চলছে শফিকের বিরুদ্ধে।

অবশ্য আইনের হাতে ধরা পড়ার আগেই ৫ আগস্টের পর সুবিধাজনক সময়ে দেশ ছেড়ে পালান ডা. জোনাইদ। অনুসন্ধান বলছে, বর্তমানে দুবাইতে আয়েশী ও বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন তিনি। বিভিন্ন সময় সেখানকার বিলাসবহুল হোটেল, বার, নাইটক্লাবে শফিকের উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।

তবে বিতর্কিত ডা. জোনাইদ এখন তোড়জোড় করছেন দেশে ফেরার। জোনাইদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে, দেশে এসে এখন বিএনপিপন্থি সেজে পূর্বের মতো আবারো আর্থিক খাতের অলিগার্ক হতে চাইছেন তিনি। সরকার এবং প্রশাসনের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের সাহায্যে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি অর্থ আত্মসাতের নতুন নতুন পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন জোনাইদ।

অনুসন্ধান বলছে, বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের এক মন্ত্রীর সঙ্গে এরই মধ্যে যোগাযোগ করেছেন ডা. জোনাইদ। পাশাপাশি বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) উচ্চ পর্যায়ের নেতার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন তিনি। গত ৩০ জানুয়ারি হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া এক বার্তায় নিজেকে বিএনপিপন্থি জাহির করতে ১৫ পয়েন্টের ফিরিস্তি দিয়েছেন জোনাইদ। ১৯৯৩ সালে বিএনপি শাসনামলে পিজি হাসপাতালে যোগদান, ১৯৯৫ সালে ড্যাবে যোগদান, ১৯৯৭ সালে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে চিকিৎসা দেওয়া, ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়াকে চিকিৎসা দেওয়া অন্যতম। এ ছাড়া ১৫টি ফিরিস্তিতে বিএনপির পক্ষে কাজ করার কিছু মিথ্যা ও ভুল তথ্যও দিয়েছেন ডা. জোনাইদ। তার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এসব ফিরিস্তির মাধ্যমে বিএনপিপন্থি চিকিৎসক পরিচয়ে দেশে ফেরার সবুজ সঙ্কেত প্রত্যাশা করছেন ডা. জোনাইদ। দেশে এসে আদালতে আত্মসমর্পণের পর শারীরিক অসুস্থতা দেখিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার আবেদন করবেন তিনি। পাশাপাশি একই কারণ উল্লেখ করে দ্রুত জামিন নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

জোনাইদের ঘনিষ্ঠ ওই সূত্র বলছে, জামিনে বের হয়ে দখল হারানো প্রতিষ্ঠানগুলো আবারো দখলের পরিকল্পনা করছেন ডা. জোনাইদ।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দেশের বাইরে পলাতক ডা. জোনাইদ শফিকের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে গত মঙ্গলবার থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। যোগাযোগের কারণ লিখে বার্তা দেওয়া হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।