ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মবের মুল্লুক চলছেই

মোস্তাফিজুর রহমান সুমন
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৫, ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ‘মব’ সন্ত্রাস ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে প্রায় দুই মাস হলেও এই সময়েও থেমে নেই ভয়ংকর এই কার্যক্রম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে মবের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি ও জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিলেও কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সর্বশেষ গত শনিবার কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একটি আস্তানায় হামলা চালিয়ে আবদুর রহমান ওরফে শামীম নামে এক কথিত পিরকে বেধড়ক পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় আস্তানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ঘটনায় রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

তথ্য অনুসারে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দেশে মব-সন্ত্রাসে ৩০৮ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে মবের ঘটনায় ১২৮ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ৯৬ জন নিহত হন। ২০২৫ সালে মব-সন্ত্রাসে ১৯৮ জনের মৃত্যু হয় এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। তা ছাড়া সংখ্যালঘুদের ওপর ২১১টি মব-সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৪৮৭টি বাসাবাড়িতে হামলা চালানো হয় এবং ৮৮টি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সংখ্যালঘুদের ১১৩টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। একই সঙ্গে ৪৭টি মন্দির-মঠ ও ১৯৪টি প্রতিমা হামলার শিকার হয়। এসব ঘটনায় ৭৮ জন আহত ও পাঁচজন নিহত হন। তবে এসব ঘটনার বেশির ভাগের তদন্তে অগ্রগতি নেই। এখনো গ্রেপ্তার হয়নি মব-সন্ত্রাসের মাধ্যমে হামলা, হত্যা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত অধিকাংশ অপরাধী। এমন পরিস্থিতিই দেশে মব-সন্ত্রাসকে উৎসাহিত করছে বলে অভিমত সমাজ বিশ্লেষকদের।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে শাসনভার গ্রহণের পর সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত দুই বছরে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৮ জন নিহত হন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় কমপক্ষে ১৯৭ জনে। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বেশির ভাগ ঘটনাই গুজবনির্ভর।

এদিকে, গতকাল বুধবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলনকক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব বা গণপিটুনির মতো ঘটনাকে ভীষণভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ফলে সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে এগোচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ডা. জাহেদ বলেন, কোনো অবস্থাতেই গণপিটুনি বা মব জাস্টিস মেনে নেওয়া হবে না। অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন, শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র রাষ্ট্রের; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং এটি সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।

মূলত ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশে মব-সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটে। এর কারণ ছিল সে সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষমতাসীনের আনুকূল্যেও তখন আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত শত্রুতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে প্রতিপক্ষকে পিটিয়ে আহত করা কিংবা হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে মব-সন্ত্রাস অনেকাংশে কমে এলেও তা অব্যাহত রয়েছে। তবে নির্বাচিত নতুন সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর অবস্থান নিয়ে মবের মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মানবাধিকার সংগঠন-সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

নতুন সরকার আসার পরও এই ধারা পুরোপুরি থামেনি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো বা তুচ্ছ কারণে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটছে।

চোর বা ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনি: গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন এলাকায় চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাগুলো জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতাকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক রং দিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করে সহিংসতা ঘটানো হচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, কোনোভাবেই মব-সন্ত্রাস বরদাস্ত করা হবে না। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিচারবহির্ভূত এই সহিংসতার ধারা অব্যাহত রয়েছে।

বর্তমান সরকার ও বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচ্ছন্ন মদতে দেশে মব-সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটে। তখন ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ একে প্রেশার গ্রুপ বলে আস্কারা দেন। ফলে দেশে উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার পরিমাণ বেড়ে যায়। আর সরকার তা বন্ধ করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তখন কোনো পদ থেকে কাউকে জোর করে নামিয়ে দেওয়াসহ নানাভাবে মবের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। যে কারণে দেশে মবকেন্দ্রিক সহিংসতা বেড়ে যায়। বর্তমানে মব-সন্ত্রাস কিছুটা কমলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে মবের শিকার হন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নবনির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। যদিও সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মব কালচার কোনোভাবেই এগোতে দেওয়া হবে না। দেশে মব কালচার বা দলবদ্ধ সহিংসতার প্রবণতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। মব সংস্কৃতি বাংলাদেশে কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না; এটি নির্মূল করা হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সময়কালে মব-সন্ত্রাস সংক্রামক রূপ নেয়। জনজীবনে একধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং রাজনৈতিক উত্তেজনাসহ বিভিন্ন বিষয়কে সামনে এনে উত্তেজিত জনতা বিচার নিজের হাতে তুলে নেয়। দেশে এমন দৃশ্য বারবার দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল মব-সন্ত্রাস দমন। গুজব ছড়িয়ে নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাউল সম্প্রদায়, ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি, সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী এমনকি মুক্তিযোদ্ধারাও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। রাজবাড়ীতে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। দেশের বড় দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ ছাড়া দাবিদাওয়া আদায়ে একাধিক পক্ষ নিয়মিত রাজপথ দখল করে সাধারণ জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সারা দেশে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে মব-সন্ত্রাস চালানো হয়। এতে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। পুলিশের ওপর মব-সন্ত্রাস, হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় বহু মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭০টি ছিল বড় ধরনের হামলার ঘটনা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ২৪টি, অক্টোবরে ৩৪টি, নভেম্বরে ৪৯টি এবং ডিসেম্বরে ৪৩টি মামলা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া আরও অনেক হামলার ঘটনা ঘটে। তবে এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার বেশির ভাগ আসামি সাবেক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়নি। এমনকি অভিযুক্ত অনেক অপরাধীকে সরকারের নানা চাপের কারণে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, দেশে মব বা গণপিটুনির মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে ছিল পরিকল্পিত উসকানি, সরকারের সহযোগী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু ব্যক্তির ইন্ধন। পাশাপাশি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, সরকারের উদাসীনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে অনীহার কারণে গণপিটুনির প্রবণতা বাড়ে। যদিও মব-সন্ত্রাসের মাধ্যমে একজন নিরপরাধ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা আইনের দৃষ্টিতে চরম অপরাধ। যারা এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে মব সহিংসতা চলমান রয়েছে; এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল ইফতেখার আহমেদ জানান, সারা দেশে মব-সন্ত্রাস দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাবের সদস্যরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। এখন কেউ মব-সন্ত্রাস ঘটানোর চেষ্টা করলেই র‌্যাব তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবে। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

মবের ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো পুরান ঢাকায় গত ৯ জুলাই ভাঙারি ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে পাথর দিয়ে থেঁতলে প্রকাশ্যে হত্যা। গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় সংখ্যালঘু যুবক দিপু চন্দ্র দাসকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার পর গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া হয়। অন্যদিকে ধারাবাহিকভাবে বাউলদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার পাশাপাশি রাজবাড়ীতে কবর থেকে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার লাশ তুলে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে পিটিয়ে-পুড়িয়ে বিকৃত উল্লাসসহ বেশ কিছু বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে। একইভাবে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ও উদীচী ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশ কোনোভাবেই মব কালচারকে প্রশ্রয় দেবে না। মব-সন্ত্রাস সহ্য করা হবে না; কঠোরভাবে তা নির্মূল করা হবে। দেশে মব কালচার বা দলবদ্ধ সহিংসতার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।