তেল সংকটে যখন চারপাশে যানবাহন মালিকদের হাহাকার তখন দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের তীব্রতায় নাজেহাল জনজীবন। গ্রীষ্মের কাঠফাটা গরমে এ কয়দিন শুধু পল্লী অঞ্চলের গ্রাহকদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে লোডশেডিংয়ে। একই যন্ত্রণায় এবার রাজধানীবাসীকেও নাজেহাল হতে হবে। কারণ হিসেবে জানা গেছে, জ্বালানি সংকটে দেশের ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বন্ধ রয়েছে অন্তত ৩৫টি। আর অবসরে চলে গেছে আরও অন্তত ২০টি। সব মিলিয়ে এখন চাহিদার তুলনায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম সরবরাহ করতে পারছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। আবহাওয়ায় পরিবর্তন না আসলে এর পরিমাণ আরও বাড়বে। এতে করে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিং আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পিডিবির তথ্যমতে, গত কয়েক দিন যাবত দেশজুড়ে দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। কিন্তু বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ সূত্রমতে, বিদ্যুতের ঘাটতি প্রতিদিন ৩ থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি। খোদ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) মতে, গতকাল বৃহস্পতিবার পিক আওয়ারে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াটের। এ পরিপ্রেক্ষিতে তারা সরবরাহ পেয়েছে ১৫ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে ওই সময়ে সরকারি তথ্যমতেই লোডশেডিং করতে হয়েছে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াটের। এর আগে নন-পিক আওয়ারে এদিন চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪৬৭ মেগাওয়াট, তখন সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ১১৬ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং করা ছাড়া সরকারের বিকল্প হাতে নেই উল্লেখ করে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকার কারণে চাহিদা না থাকায় সব বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে হয় না। কিন্তু সম্প্রতি জ্বালানি সংকটে চালু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোও উৎপাদন করতে পারছে না।
আদানির একটি ইউনিটও বন্ধ রয়েছে। পায়রার আরএনপিএল, চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট কেন্দ্রগুলোয় কয়লার অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের কয়লা আমদানির একমাত্র উৎস ইন্দোনেশিয়া। কিন্তু দেশটি নিজেরাই কয়লার উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে আমাদেরও চাহিদামাফিক সরবরাহ করতে পারছে না। এ ছাড়া গ্যাস এবং ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তো রয়েছেই। যেগুলো চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন করতে পারছে না। তবে আমরা তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি। এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টও কাল শনিবার থেকে উৎপাদনে আসার কথা জানিয়েছে আমাদের। আদানির বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিটটিও দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালু হয়ে যাবে বলে আশা করছি। এই মুহূর্তে আসলে আমাদের আশা করা ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ সংকটটা শুধু আমাদের একার না। সংকটটা বিশ^ব্যাপী।
এদিকে প্রতিবেদন লেখাকালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় উত্তরবঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের বড় উৎস দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এর তিনটি ইউনিটের মধ্যে সচল ১ নম্বর ইউনিটটিরও উৎপাদন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। পিডিবির পরিচালক (জনসংযোগ) মো. শামীম হাসান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, গত বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ১ নম্বর ইউনিটটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়েছে দিনাজপুরসহ উত্তরের আট জেলা। কয়লার সঙ্গে পাথর আসায় ১ নম্বর ইউনিটের বয়লারের পাইপ ফেটে কুলিং ফ্যান ভেঙে গেছে। এতে বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে এটি ঠিক হয় সে জন্য মেরামতের কাজ চলছে। এটি মেরামত করে উৎপাদন শুরু করতে চার-পাঁচ দিন লাগতে পারে।
এর আগে দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ রয়েছে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ২ নম্বর ইউনিট এবং ২৭৫ ইউনিট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিট। ফলে কেন্দ্রটি থেকে প্রায় ৪শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আপাতত পাচ্ছে না জাতীয় গ্রিড। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও উত্তরাঞ্চলে চাহিদা পূরণে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, অন্যদিকে সরবরাহ ঘাটতিতে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের মানুষ। দিনাজপুরের কলেজ রোডের স্কুলশিক্ষিকা অপর্ণা শিকদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, সারা দিনে ৪ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। না পারছি রান্না করতে, না পারছি ফ্রিজের কোনো খাবার খেতে। সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে পুড়ছে অঞ্চলটি। এই গরমে সেখানে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সকাল, ভোর কিংবা গভীর রাতÑ বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছেই।
ভুগছেন ওই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বেগম খালেদা জিয়া হলের এক শিক্ষার্থী জানান, হলের অনেকেই হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন বিদ্যুৎ না থাকায়। অনেকে আবার হল ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। এত গরমে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকে তাহলে পড়ালেখা তো দূরে থাক, বেঁচে থাকাই মুশকিল।
এদিকে আমদানি করা বিদ্যুতেও কোনো সুখবর পাওয়া যায়নি। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আদানির নষ্ট হয়ে যাওয়া ইউনিটটি ঠিক হয়নি। আদানি পাওয়ারের বাংলাদেশ অফিস জানায়, গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বিয়ারিং থেকে সতর্ক সংকেত পাওয়া যায়। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। মেরামত কাজ শেষ হতে তিন-চার দিন সময় লাগতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাত ১২টায় আদানি থেকে পাওয়া গিয়েছিল ১ হাজার ৪৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। রাত ২টায় তা নেমে আসে ৭৬৪ মেগাওয়াটে। গত বুধবার রাতে পিজিসিবির ওয়েবসাইটে সর্বশেষ বিকেল ৪টায় এ তথ্য দেওয়া হয়েছিল। আদানির সরবরাহ কমায় রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটে। কোথাও কোথাও লোডশেডিং ১৫-১৬ ঘণ্টায় পৌঁছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি সংকট দেখা দেয় বিশ্বজুড়ে। কয়লা, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অভাবে দেশে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি। এর মধ্যে গ্যাস স্বল্পতায় ১৩টি, জ্বালানি তেল না থাকায় ৯টি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন তালিকার বাইরে আছে। বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ১৭টি সৌর, যা থেকে রাতে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। ডিজেলচালিত পাঁচটি কেন্দ্রও বন্ধ রাখা হয় খরচ বেশি হওয়ায়। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটের কারণে সেখান থেকে পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৩৫টি চলমান বিদ্যুৎকেন্দ্র জ¦ালানি সংকটে উৎপাদন করতে পারছে না। গরমের শুরুতে এখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও সব মিলিয়ে উৎপাদন করা যাচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরু থেকে লোডশেডিং বাড়লেও ঢাকায় তেমন বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল না। তবে গত বুধবার থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যায়। রাজধানীর বাইরের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। ঢাকার পাশের গাজীপুর থেকে শুরু করে কুষ্টিয়া, নাটোর, নোয়াখালী, রাজবাড়ী, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেক বা তারও কম থাকায় দিনরাত দফায় দফায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে। টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার কারখানায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানা মালিকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদনে ধস নামবে উল্লেখ করে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র পরিচালক ফয়সাল সামাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেই সংকট দেখা দিতে পারে। আমরা তো নিরুপায়। কল-কারখানার চাকা না ঘুরলে উৎপাদন হবে কীভাবে? আর উৎপাদন না হলে ক্রয়াদেশ পূরণ করব কীভাবে?
রূপালী বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যমতে, কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ১৬-১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র পাঁচ থেকে সাত মেগাওয়াট। ফলে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২ ঘণ্টাই লোডশেডিং হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও রোগীরা বেশি কষ্টে পড়ছেন। নাটোরে দিনরাতে চার-পাঁচবার লোডশেডিং হচ্ছে। সন্ধ্যাকালীন চাহিদা ১৫৩ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে ৯৩ মেগাওয়াট। এতে শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই জেলার লালপুরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৬ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। নোয়াখালীতে ৯ লাখের বেশি গ্রাহকের বিপরীতে চাহিদার তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের হাতে পাখা দিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে।
জেনারেটর বা বিকল্প ব্যবস্থার অভাবে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলায় শিক্ষার্থীরা বলছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হবিগঞ্জে চাহিদার ১৮ মেগাওয়াটের মধ্যে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট। ফলে দিনভর লোডশেডিংয়ে নাজেহাল হচ্ছে শহরবাসী। সিলেট, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াÑ সব জায়গার পরিস্থিতি একই বলে জানিয়েছেন প্রতিনিধিরা।




সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন