দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত ও আধিপত্য বিস্তারের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আশঙ্কাজনক এমন পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে অপরাজনীতিকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি রোধে সোচ্চার হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। একই সুর ধ্বনিত হচ্ছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের কণ্ঠে। তারা ক্যাম্পাসে আধিপত্যবাদী মনোভাব পরিহার করার পাশাপাশি ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দিতে ছাত্রসমাজের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচার না ফিরলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ পুরোপুরি বিপন্ন হবে।
গত কয়েক দিন ধরে ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহার ও ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখোমুখি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজধানীর শাহবাগ, পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ও কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দুই সংগঠনের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। শাহবাগের ঘটনার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও শোডাউন দিয়েছে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির। অভিযোগের আঙুল তুলেছে একে অপরের দিকে।
চলমান বিরোধ ছড়িয়ে পড়েছে ছাত্রদল ও শিবিরের অভিভাবক সংগঠন বিএনপি-জামায়াতের মধ্যেও। বিষয়টি গড়িয়েছে জাতীয় সংসদেও। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও উত্তপ্ত বিষয়টি ঘিরে। গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের পাশাপাশি ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও তুলছেন ছাত্রদলের অনেকে। টানা উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি অনড় অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা সহজে মিটবে না। দিন যত গড়াবে, সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটবে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সরকারও চাপে পড়বে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ৫ আগস্টের আগে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি তারা কখনোই চায় না। মানুষ এখন মৌলিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করে, যা কেবল প্রশাসনিক সংস্কার বা কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই পরিবর্তন প্রতিফলিত হতে হবে মানুষের আচরণে, রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাকর্মীদের কার্যক্রমে এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক চর্চায়। প্রকৃত পরিবর্তন কাঠামোতে নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আচরণগত রূপান্তরের মধ্যে নিহিত।
তিনি আরও বলেন, রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের নীতি-নৈতিকতা ও আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটার প্রত্যাশা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশের যেন কোনোভাবেই অতীতের তুলনায় অবনতি না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন সরকারের মেয়াদ এখনো মাত্র আড়াই মাস। এই সময়ে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত নয়, যা সরকারের স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরসহ অন্যরা একসঙ্গে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ সরকারকে বিতাড়িত করেছিল। কিন্তু সেই পথচলা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিপরীত অবস্থানে চলে যায় দল দুটি। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা সময়ে ঘটে হামলা ও পাল্টা হামলা। সর্বশেষ চট্টগ্রাম সিটি কলেজের দেয়ালে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি লেখাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের দফায় দফায় সংঘর্ষের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। এরপর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলোতে ছাত্রদল দেয়ালে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ গ্রাফিতি আঁকে। ক্যাম্পাসের বাইরেও জেলা-উপজেলায় ছাত্রদল-শিবির পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ এনে বিক্ষোভের পাশাপাশি জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে বাগ্্বিত-া হয়। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
চলমান ইস্যু নিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিমুদ্দিন আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ছাত্ররাজনীতিতে কুরুচিপূর্ণ আচরণ ও ব্যক্তিগত আক্রমণ বন্ধ করে ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ‘পরিবেশ পরিষদ’ গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজনীতিক বা তাদের পরিবারের সদস্যদের বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা জঘন্যতম নোংরামি। এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচারের প্রতিবাদ হওয়া স্বাভাবিক।
ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নাজিমুদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের উচিত সব ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে নিয়মিত বসা। পাক্ষিক বা মাসিক মিটিংয়ের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান বা ‘সর্ট আউট’ করা। তিনি আরও বলেন, ছাত্ররাজনীতিতে কোনো ধরনের আধিপত্যবাদ বা স্বৈরাচারী মনোভাব কাম্য নয়। সব ক্রিয়াশীল সংগঠনকে নিয়ে পরিবেশ পরিষদ গঠন করতে হবে। সুন্দর পরিবেশ ও বৈষম্যহীন আচরণের মাধ্যমেই ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব।
ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার নিয়ে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দের ব্যবহার বিএনপি নেতা তারেক রহমানই প্রথম শুরু করেছিলেন, যা এখন ছাত্রদল ব্যবহার করছে। তারা নিজেরাও অনেকটা ‘গুপ্ত’ অবস্থায় আছে; তাদের ১৮ জনের কমিটি করলে দেখা যায় ১৩ জনই ছাত্রলীগের লোক। তিনি আরও বলেন, জাইমা রহমানসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট কারা করছে, তাদের আগে চিহ্নিত করা এবং আইনের আওতায় আনা দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সে নিজেই তো ভিকটিম। তার নাম ব্যবহার করে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। অথচ সে যখন অভিযোগ জানাতে থানায় গেল, তখন তার ওপর হামলা করা হলো। তিনি বলেন, শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশের জন্য সব ছাত্র সংগঠনকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। কেউ যেন কারো পাতা ফাঁদে পা না দেয়। তিনি আরও বলেন, সহাবস্থানের ভিত্তিতে প্রতিটি সংগঠনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ধৈর্য ধরে চলা জরুরি, তবে কোনো পক্ষ থেকে বাড়াবাড়ি করা হলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
এমন পরিস্থিতি চলমান থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে ধারণা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকদের। তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগের শেষ দিকে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য ছিল। সে সময় বিরোধী দলগুলো ক্যাম্পাসে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। তখন ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে সংঘাতের পাশাপাশি বিরোধী দলের সঙ্গে খুব একটা সংঘাত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদল এবং শিবির উভয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।
পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে পুনরায় বৈষম্য ও দলীয়করণের প্রবণতা বাড়ছে বলে অভিযোগ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম। গতকাল শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতার রাজনীতি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ফ্যাসিবাদ বা কোনো স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হলে জনগণ আবারও সংগঠিত হবে, এনসিপির ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। তারা বলেন, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর।
আতঙ্কিত শিক্ষার্থীরা : ক্যাম্পাসগুলোতে সহিংসতার ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আবারও শিক্ষাঙ্গনে দখলদারিত্বভিত্তিক পুরোনো ছাত্ররাজনীতি ফিরে আসছে। তারা বলছেন, সংঘর্ষ, মারামারি ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে নষ্ট করছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি করছে অনিশ্চয়তা। তারা আরও বলেন, যদি ক্যাম্পাস আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তাহলে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ও পিছিয়ে যাবে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে। সেশনজটের গ্যাঁড়াকলে পড়ে নষ্ট হবে তাদের জীবনের মূল্যবান সময়। এ জন্য তারা সব ছাত্র সংগঠনের প্রতি ধৈর্যশীল ও সহমর্মী আচরণ প্রত্যাশা করেন।




