দেশের রাজস্ব কাঠামোতে কর ফাঁকির প্রবণতা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা হিসেবে রূপ পেয়েছে। এখানে উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের আয় গোপন করা বা কর ফাঁকি দেওয়া অনেক সহজ। তাদের উচ্চ আয় করনেটে যুক্ত করতে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে কোনো কোম্পানিকে ‘ট্র্যাকার’ বসানোর কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।
দেশে উচ্চ আয়ের ডাক্তার, আইনজীবী, কনসালটেন্ট ও ফ্রিল্যান্স প্রকৌশলীরা বেশি আয় করেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এই তাগিদ দেওয়া হয়। আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সদস্য ড. মোহাম্মদ মাসুদ আলম বলেন, ‘উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের আয় জানা যায় না। যেমন ডাক্তার, আইনজীবী, কনসালটেন্ট, ফ্রিল্যান্স প্রকৌশলীদের আয় সঠিকভাবে ট্র্যাক করা হয় না। ট্র্যাক করার মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের টেকনিক্যাল দক্ষতা এখনো তৈরি হয়নি। ফলে কর ফাঁকি বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামোতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।’
প্রস্তাবনা তুলে ধরে ড. মোহাম্মদ মাসুদ আলম বলেন, ‘ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্ল্যাটফর্মভিত্তিক আয় করের বাইরে, বিদেশি ডিজিটাল কোম্পানির ওপর কর সীমিত, রিয়েল স্টেট এবং ব্যক্তিগত ও পরিবারকেন্দ্রিক সম্পদভিত্তিক আয় এবং সম্পদমূল্য অবমূল্যায়িত থেকে যায়। মেট্রোপলিটন ও সিটি করপোরেশনকেন্দ্রিক শহরগুলোতে বাড়ি ভাড়া আয় নগদ অর্থে পরিশোধ করা হয় বলে ওই আয় বর্তমান কর আওতায় উল্লেখযোগ্যভাবে আনরিপোর্টেড।’
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রস্তাবনা : কর ফাঁকি বন্ধ করতে এনআইডি, টিআইএন ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং সম্পত্তির তথ্য একীভূত করে একটি ‘ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল আইডেন্টিটি সিস্টেম’ চালু করা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ব্যক্তির আর্থিক লেনদেন ট্র্যাকযোগ্য হবে।
একাধিক সম্পদ বা আয়ের উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং কর ফাঁকির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। ভারত, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের রাজস্ব ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রকাশনা বিশ্লেষণ করে আমরা বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নতুন কর-ভিত্তি হিসেবে ৫টি অগ্রাধিকার খাত বিবেচনা করার প্রস্তাব করা হয়।
ডিজিটাল ট্যাক্স প্রশাসন : ভারতের আধার কার্ডের উদাহরণ তোলেন তারা। কর প্রশাসনব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে যে প্রস্তাবটি করছি, তা হচ্ছে ভারতের আধার কার্ডের মতো ডেটা সমন্বয়ের মাধ্যমে অনুরূপ একটি ডেটা ড্রাইভের ট্যাক্স সিস্টেম গড়ে তোলা। আধুনিক কর প্রশাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণগুলোর একটি। যেখানে সরকার প্রতিটি নাগরিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়, ডিজিটাল লেনদেন এমনকি বড় অঙ্কের ব্যয়ও ট্র্যাক করতে পারে। এর ফলে আয় গোপন করা বা কর ফাঁকি দেওয়া অনেক কঠিন এবং সরাসরি কর সংগ্রহ উল্লেখযোগ্য বেড়েছে।
বাংলাদেশে কর ফাঁকির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো আবাসন খাত। জমি ও ফ্ল্যাটের লেনদেনে প্রকৃত মূল্য গোপন করা হয় এবং অনেক সময় একই ব্যক্তি একাধিক সম্পত্তির মালিক হলেও করের আওতায় আসেন না। এই সমস্যার সমাধানে একটি জমি ও সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশনে ডিজিটাল সিস্টেম তৈরি করা জরুরি, যা জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। প্রতিটি সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের সময় বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সেই তথ্য সরাসরি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও ডেটাবেজে যাবে। একই সঙ্গে সম্পত্তির ঘোষণাপত্র পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট মূল্যমানের (যেমন ৫০ লাখ টাকার বেশি) সম্পদ থাকলে তা কর রিটার্নে উল্লেখ বাধ্যতামূলক হবে।
এই ব্যবস্থা চালু হলে একজন ব্যক্তি যদি একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ি বা উচ্চমূল্যের সম্পদ নিজের বা পরিবারের সদস্যদের নামে রাখেন, তা হলেও তা এনআইডি লিংকেজের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে প্রক্সি মালিকানা বা কিংবা বেনামি সম্পদের মাধ্যমে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কমে যাবে। ভারতের আধার কার্ড মূলত এটি করেছে।
ভাড়া বাসা কর আয় ট্র্যাক করা : বাংলাদেশে ভাড়া বাসা থেকে আয় একটি বড় কিন্তু প্রায় অদৃশ্য কর-ভিত্তি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাড়ার আয় নগদে পরিশোধ করা হয় বলে আনুষ্ঠানিকভাবে করযোগ্য আয়ের ক্ষেত্রে প্রদর্শন করা হয় না এবং কর প্রদান করা হয় না।
উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৩০ হাজার টাকার বেশি হয়, তা হলে ব্যাংক বা মোবাইল পেমেন্টের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধের সময় একটি ছোট অংশ (যেমন ৫%) কর হিসাবে কেটে নেওয়া যেতে পারে।

