ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

কম্বোডিয়ায় গিয়ে স্বপ্নভঙ্গ

সামজীদ হোসেন
প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬, ০৫:৩৬ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

কম্বোডিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের দুর্দশা দিনে দিনে চরম আকার ধারণ করছে। কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে দেশটিতে গিয়ে অনেকেই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমিকেরা সেখানে গিয়ে ঠিকমতো কাজ পাচ্ছেন না, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে অবৈধ কাজেও জড়িয়ে পড়ছেন। ভুক্তভোগীদের কমরুল বলেন, দেশে বসে যেসব বেতন ও সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার সঙ্গে কোনো মিল নেই। অনেককে দীর্ঘ সময় কাজ করানো হলেও যথাযথ বেতন দেওয়া হচ্ছে না। কেউ কেউ পাসপোর্ট আটকে রেখে জোরপূর্বক কাজ করানোর অভিযোগও করেছেন। ফলে তারা দেশে ফিরতেও পারছেন না।

এদিকে ভাষাগত সমস্যা, আইনি সহায়তার অভাব এবং দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের জটিলতায় তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাচ্ছে। অসুস্থ হলেও অনেকেই চিকিৎসা পাচ্ছেন না, আবার অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। কম্বোডিয়ায় গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পেয়ে দালালচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে চরম ভোগান্তিতে আছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

জিম্মি করে টাকা আদায়, কাজের অনিশ্চয়তা ও জীবনযাত্রার সংকটে অনেকে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরছেন, আবার কেউ কেউ সেখানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।‎ দেশের গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় পাঠাচ্ছে একশ্রেণির দালাল। কেউ কেউ ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গেলেও সম্প্রতি বেশির ভাগই যাচ্ছেন ট্যুরিস্ট ভিসায়।‎ সেখানে গিয়েও তারা আবার দালালচক্রের কবলে পড়ছেন। যাদের ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হচ্ছে, তার বেশির ভাগই ভুয়া। আবার যেগুলো বৈধ, সেগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশি দালালচক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কম্বোডিয়ায় গিয়ে বেশির ভাগ প্রবাসীই চুক্তিপত্র অনুযায়ী  কাজ পান না। ‎আর ট্যুরিস্ট ভিসায় যাওয়া ব্যক্তিরা আরও বেশি বিপদে পড়েন। সাম্প্রতিক  অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

‎একজন প্রবাসী বলেন, কম্বোডিয়ায় যেতে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত খরচ হয়। ওয়ার্ক পারমিট ভিসার কথা বলা হলেও গত কয়েক মাসে অনেককে ট্যুরিস্ট ভিসায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে সাধারণত নির্মাণকাজে পাঠানো হয়।

সিরাজগঞ্জের ফয়সাল আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি চার মাস আগে কম্বোডিয়ায় এসেছি। ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৮০ হাজার টাকার মতো বাড়িতে পাঠাতে পেরেছি। এখন কাজ নেই। অন্য কাজের চেষ্টা করেও পাচ্ছি না। বাড়িতে জমি বন্ধক দিয়ে ঋণ করে কম্বোডিয়ায় এসেছি। বাড়ি থেকে মা-বাবা বারবার বলে, ঋণ শোধ না করে দেশে আসবা না। অথচ এখানে যে অবস্থা, এটা উপার্জন করতে হলে সারা জীবন পার হয়ে যাবে। বাড়ির এসব চিন্তা করে বর্তমানে আমার অবস্থা খুবই নাজেহাল, যা ভাষায় প্রকাশ করে বলতে পারছি না।’

কম্বোডিয়ায় ব্যবসারত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমি কম্বোডিয়ায় সাত বছর হলো আছি। এখানে একটি সুপার শপ দিয়েছি। এর সুবাদে অনেক দেশি ভাইদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়।’ তিনি বলেন, ‘যারা এখানে কাজের ভিসা নিয়ে এসেছে, তাদের বেতন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার ওপরে হয় না। তাই মানবতের জীবনযাপন করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণের টাকা দেশে পাঠাতে পারছে না।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, কম্বোডিয়ায় একটি দালালচক্র আছে, যারা স্বয়ংক্রিয়। এদের মধ্যে একজন মাসুম রেজা, তার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন দালালচক্রের সদস্য রয়েছেন। তারা হলেন- আব্দুল আলিম, সনেট, রুহুল আমিন হাওলাদার, সানোয়ার হোসেন। তাদের চক্রে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন কম্বোডিয়ায় থাকা কুষ্টিয়ার রাহাত।

রাহাত রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘মাসুম রেজাদের একটি দালাল গ্রুপ বাংলাদেশেও আছে। তারা বাংলাদেশ থেকে উন্নত জীবনযাপন, অনেক বেশি বেতন, সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রলোভন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় পাঠায়। যাওয়ার পর কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। কাজ না থাকায়, ভিসার  মেয়াদ না থাকায় অনেককে পালিয়ে বেড়াতে হয়। অনেকে বাড়ি থেকে আবার টাকা নিয়ে চোরাই পথে থাইল্যান্ডে গিয়ে দেশে ফিরে যায়। এভাবে দেশে ফিরতে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হয়। আমরা বিদেশে এসে দালালচক্রের হাতে পড়ে খুবই অসহায়। এদিকে ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে যারা পরে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে পারেন না, তাদের দেশে ফেরাতে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।’

অনেককে অবৈধভাবে থাইল্যান্ড সীমান্তে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে থাই পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর দু-এক দিন আটক রেখে দেশে পাঠানো হয়। এ প্রক্রিয়ায় থাইল্যান্ডের একটি চক্রের সঙ্গেও বাংলাদেশি দালালদের যোগসূত্র রয়েছে।

সূত্র জানায়, মাসুম রেজা ও তার দালাল চক্রের নামে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড দুই দেশেই মামলা রয়েছে।

‎জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২২টি এজেন্সির মাধ্যমে ১৩ হাজার ১১৭ জন বাংলাদেশি সেখানে গেছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত গেছেন ৪ হাজার ৪৪ জন। তাদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরেছেন, সেই তথ্য নেই। তবে প্রতিদিনই কম্বোডিয়া থেকে প্রবাসীরা দেশে ফিরছেন।

চলতি মাসে এক দিনেই ১০২ জন একই ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন।

‎কম্বোডিয়ায় মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোকে পাঠিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো পাবনা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, বিএইচবি ওভারসিজ লিমিটেড, টিএম ওভারসিজ, আল জামীর ওভারসিজ ও মেসার্স আইনুর করপোরেশন লিমিটেড।

২০২৬ সালের এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত অবৈধ বা অনিয়মিত বাংলাদেশি নাগরিকদের, বিশেষ করে অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করা ব্যক্তিদের, আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে দেশে ফেরার বিশেষ সুযোগ দিয়েছে কম্বোডিয়া সরকার। এই সময়ের মধ্যে ট্রাভেল পাস ও জরিমানা মওকুফের সুবিধা পাওয়া যাবে। এরপর অবৈধদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা ও জেল-জরিমানা করা হবে বলে যানান কম্বোডিয়া সরকার।

ব্যাংককের বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, অনিয়মিত বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফেরার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ট্রাভেল পাস পেতে সরাসরি আবেদনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সিআইডি এএসপি মোহাম্মদ বদরুল আলম মোল্লা বলেন, ‘আমরা মানবপাচার বন্ধে কাজ করছি। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ থাকলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে এটা নিয়ে কাজ করি। সম্প্রতি কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে প্রতারিত এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ পেয়েছি। তার অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে আমাদের তদন্ত চলমান। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা ভিকটিম যদি আমাদের কাছে অভিযোগ করেন, সেটা আমরা খতিয়ে দেখি। ‎পৃথিবীর যেকোনো দেশে কেউ যদি বন্দি থাকে অথবা দুষ্টচক্রের কবলে পড়ে, আমরা সব সময় এ বিষয়ে কাজ করতে প্রস্তুত এবং করেও যাচ্ছি। তবে সম্প্রতি কম্বোডিয়ার দুটি স্কেম সেন্টার বন্ধ হয়েছে। ওইখানে যারা বিপদে ছিল তাদের মধ্যে অনেককে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে আমাদের তৎপরতা ও সতর্কতার কারণে বর্তমানে এই অপরাধগুলো অনেক কমে এসেছে। আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তবে যারা বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাচ্ছে, তাদের অবশ্যই যাওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করে যাওয়া উচিত বলে মনে করি।’