কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সামর্থ্যবান নর-নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব। এটি মৌলিক ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আদম আলাইহিস সালাম থেকে সব যুগে কোরবানি ছিল। তবে তা আদায়ের পন্থা এক ছিল না। পশু জবাই করে কোরবানি করার মধ্যে আল্লাহ তা’আলার মহব্বতে নিজের সব অবৈধ চাহিদা ও পশুত্বকে কোরবানি করা এবং ত্যাগ করার হিকমত ও শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা আরও এরশাদ করেনÑ ‘মনে রেখো, কোরবানির পশুর গোশত অথবা রক্ত আল্লাহর কাছে কখনোই পৌঁছায় না; বরং তার কাছে কেবলমাত্র তোমাদের পরহেজগারিই পৌঁছায়।’ (সুরা- হজ্জ : আয়াত-৩৭)
সুতরাং কোরবানি থেকে কুপ্রবৃত্তি দমনের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। তাই কোরবানির মধ্যে ইবাদাতের মূল বিষয় তো আছেই, সেই সঙ্গে তাকওয়ার অনুশীলনও রয়েছে। কোরবানির ঈদ আনন্দময় হয় কোরবানির পশু দিয়েই। ঈদের আগে পরিবারে আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয় কোরবানির পশু ঘিরে।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে কোরবানির পশুর হাট বসাতে ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনগুলো। এ বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুর হাট বসানো হবে। আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় এবার ২৭টি অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় থাকছে ১১টি হাট। অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১৬টি হাট বসবে, যার মধ্যে গাবতলীর স্থায়ী হাটটিও অন্তর্ভুক্ত। এদিকে প্রচলিত হাটের পাশাপাশি অনলাইন ও খামারভিত্তিক বিক্রয়েও ক্রেতাদের আগ্রহ আগের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে বাড়ি থেকে পশু বাছাই করতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন।
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশে^র হাসান জানান, ডিএসসিসি এলাকায় ১১টি স্থানের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের ঘোষিত ১১টি হাটের মধ্যে ৯টিতে সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দর পাওয়া গেছে, তবে দুটি হাটের দর সন্তোষজনক না হওয়ায় এই দুটি হাটের বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতাদের হাটের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসির আওতাধীন অস্থায়ী যে হাটগুলো বসবেÑ পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিমাংশে নদীর পাড়ের খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিসংলগ্ন মৈত্রী সংঘের মাঠ, রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি স্থান, আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গা ও শ্যামপুর কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায়। এ ছাড়া আফতাবনগরের বিভিন্ন ব্লক, শিকদার মেডিকেল-সংলগ্ন এলাকা, কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল পর্যন্ত রাস্তার খালি জায়গা, দয়াগঞ্জ থেকে জুরাইন রেলক্রসিং পর্যন্ত রাস্তার স্থান, বনশ্রী হাউজিংয়ের খালি এলাকা, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের পার্শ্ববর্তী জমি ও গোলাপবাগ স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর দিকে অস্থায়ী হাট বসানো হবে।
অন্যদিকে, ডিএনসিসির অস্থায়ী হাটগুলো হবেÑ মিরপুর সেকশন-৬ (ইস্টার্ন হাউজিং) এলাকায়, মিরপুর কালশী বালুর মাঠের ১৬ বিঘা খালি জায়গায়, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন এলাকায়, মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার-সংলগ্ন খালি জায়গায় ও পূর্ব হাজীপাড়ায় ইকরা মাদ্রাসার পাশের খালি জায়গায়। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের বছিলায় ৪০ ফুট রাস্তা-সংলগ্ন খালি জায়গায়, উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন বউবাজার এলাকায়, ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা থেকে ১০ নম্বর সেক্টর রানাভোলা অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন উত্তরা রানাভোলা স্লুইসগেট পর্যন্ত এলাকায়, কাঁচকুড়া বাজারসংলগ্ন রহমাননগর আবাসিক এলাকায়, মস্তুল চেকপোস্ট-সংলগ্ন পশ্চিম পাড়ায়, ভাটারা সুতিভোলা খাল-সংলগ্ন খালি জায়গায়, বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গা, মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠের জায়গা, বাড্ডা থানাধীন স্বদেশ প্রপার্টির খালি জায়গা ও বড় বেরাইদ বসুন্ধরা গ্রুপের খালি জায়গা।
ডিএনসিসির ১০টি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। ইজারা পাওয়া হাটগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ মিরপুর সেকশন-৬-এর ইস্টার্ন হাউজিং-সংলগ্ন খালি জায়গা (এক কোটি ৭৯ লাখ টাকা), মিরপুর কালশী বালুর মাঠ (৩০ লাখ ১১ হাজার টাকা), ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন খালি জায়গা (তিন কোটি ৮৭ লাখ টাকা), ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব হাজীপাড়ার ইকরা মাদ্রাসার পাশে (১২ লাখ ৫৩ হাজার টাকা), ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাঁচকুড়া বাজার-সংলগ্ন রহমাননগর (২৭ লাখ টাকা), খিলক্ষেতের মস্তুল চেকপোস্ট-সংলগ্ন খালি জায়গা (তিন কোটি সাত লাখ টাকা), বনরূপা আবাসিক প্রকল্প এলাকা (এক কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার টাকা), বাড্ডার স্বদেশ প্রপার্টিজ (দুই কোটি ৩৩ লাখ টাকা) এবং বড় বেরাইদে বসুন্ধরা গ্রুপের খালি জায়গা (পাঁচ কোটি ৭০ লাখ টাকা)।
ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন জানান, যে ১০টি হাটের সর্বোচ্চ দরদাতা পাওয়া গেছে, তাদের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি হাটে কাক্সিক্ষত দর মিললে সম্পত্তি বিভাগ থেকে ইজারা দেওয়া হবে। দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের দিনসহ মোট পাঁচ দিন এসব হাটে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রয়-বিক্রয় চলবে। কোরবানির পশুর হাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করছে দুই সিটি করপোরেশন। সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে এবং প্রতিটি বড় হাটে একাধিক ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম থাকবে যারা প্রতিটি পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ ছাড়া কোনো পশুকে হাটে তোলা যাবে না। নিরাপত্তার পাশাপাশি যানজট নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য অপসারণ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশনগুলো আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করতে যাচ্ছে। প্রত্যেক হাটে আলো, পানি ও স্যানিটেশনব্যবস্থা উন্নত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অস্থায়ী হাটগুলোতে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ ও পরিবেশ দূষণ রোধে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ট্রাফিক বিভাগ বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে যাতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়।
এদিকে কোরবানির পশুর হাটের পাশাপাশি অনলাইনে গরু-ছাগল কেনাবেচা এখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। খামার মালিকদের অনেকেই নিজস্ব ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। অনলাইনে পশু কেনাবেচার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কোনো অতিরিক্ত ‘হাসিল’ বা খাজনা দিতে হবে না বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
ক্রেতারা অনলাইনে পশুর ছবি, ভিডিও, ওজন, খাদ্যতালিকা ও খামারের অবস্থানকে দেখে সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। এতে সময় বাঁচছে, হাটের ভিড়ও এড়ানো যাচ্ছে। বিশেষত যেসব ক্রেতা নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে হাটে যেতে চান না, তাদের জন্য ডিজিটাল হাট একটি বড় সুবিধা হিসেবে কাজ করছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার খামারগুলোতে ইতোমধ্যে ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে।

