বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য এবং সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন তিনি। গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তোফায়েলের জামাতা তৌহিদুজ্জামান তুহিন এবং স্ত্রীর বড় ভাই মামুন তালুকদার শেখ।
স্কয়ার হাসপাতালের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়েছে, বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে নিউমোনিয়াজনিত শ^াসকষ্ট, হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রায়হান রাব্বানীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তোফায়েল আহমেদের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল খায়ের জানান, গতকাল সোমবার বাদ মাগরিব ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে প্রয়াত এই আওয়ামী লীগ নেতার জানাজা হয়। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। প্রয়াতের স্ত্রীর বড় ভাই মামুন তালুকদার শেখ গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, আজ মঙ্গলবার সকালে হেলিকপ্টারে করে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতাকে ভোলা নেওয়া হবে। পরে বাদ জোহর ভোলা জিলা স্কুল মাঠে জানাজা শেষে গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার কবরের পাশে দাফন করা হবে।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক হিসেবে পরিচিত এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ক্ষেত্রে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। তিনি ভোলা থেকে ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং বিভিন্ন মেয়াদে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মৌলভী আজহার আলী ও মা ফাতেমা বেগম।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন। রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদের হাতেখড়ি হয় ছাত্রলীগের মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন।
১৯৬৮-৬৯-এ গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলনে তিনি ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের কারণে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব আসামিকে মুক্তি দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সেই বছরেরই ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান) এক সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সম্মেলনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ।
প্রথমবারের মতো ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় লাভ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পরের বছর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নিজের জেলা ভোলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। পরবর্তী সময়ে ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সাল থেকে টানা ৩৩ মাসসহ অসংখ্যবার কারাভোগ করেন এই নেতা।
রাজনৈতিক মহলে বলা হয়, ২০০৭-০৮ সময়ে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের সংস্কারের পক্ষে মত দিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব তথা শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হয়েছিলেন তোফায়েল। সে কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তাতে মন্ত্রিসভায় নেননি শেখ হাসিনা। অবশ্য পরে ২০১৪-২০১৯ মেয়াদের সরকারে তাকে আবার মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব দেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন