× UCB Sticker Card
সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ০৪:৫৭ এএম

রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলা

সোহেল-স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ০৪:৫৭ এএম

সোহেল-স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে সোহেলকে পাঁচ লাখ এবং স্বপ্নাকে দুই লাখ টাকা অর্থদ- দেওয়া হয়েছে। অর্থদ-ের টাকা আদায়ে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রির নির্দেশ দিয়ে সেই অর্থ ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রদানের আদেশও দেওয়া হয়েছে। 

গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল রানাকে কাঁদতে দেখা যায়। অন্যদিকে স্বপ্না আক্তার ছিলেন নির্বাক। রায়ের পর সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

রায়কে কেন্দ্র করে এদিন সকাল থেকেই আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বহুল আলোচিত এ মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তির রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত শিশুর পরিবার, রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও।

রোববার ঘড়ির কাঁটায় ঠিক বেলা ১১টা। বিচারকের ব্যক্তিগত সহকারী সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঘোষণা দেন, বিচারক আসছেন। মুহূর্তেই এজলাসে নেমে আসে নীরবতা। এরপর ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এজলাসে এসে আসন গ্রহণ করেন।

দিনের কার্যক্রম শুরু করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতকে জানান, রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি এদিন রায় ঘোষণার জন্য ধার্য রয়েছে এবং রাষ্ট্রপক্ষ প্রস্তুত। জবাবে বিচারক বলেন, আমিও রায় ঘোষণার জন্য প্রস্তুত। এরপরই তিনি রায়ের পর্যবেক্ষণ পাঠ শুরু করেন।

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালতকক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ, মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী, নিহত রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাসহ বিপুলসংখ্যক আইনজীবী ও সংবাদকর্মী। সবার চোখ ছিল বিচারকের দিকে।

রায়ের আগে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দুই আসামি সোহেল ও স্বপ্নাকে আদালতে আনা হয়। সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে স্বপ্না আক্তার এবং বেলা পৌনে ১১টায় সোহেল রানাকে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানা থেকে তাদের আদালতে নেওয়ার পথে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে পুলিশ। আসামিদের বহনকারী গাড়ির সামনে ও পেছনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন।

কাঠগড়ায় তোলার সময় আদালত চত্বরে উপস্থিত কয়েকজন আইনজীবী ‘খুনি, খুনি’ বলে স্লোগান দেন। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভিন্ন মন্তব্যও করেন। প্রধান আসামি সোহেল রানার মাথায় নিরাপত্তা হেলমেট পরানো ছিল। দুই হাত পেছনে রেখে হাতকড়া লাগানো অবস্থায় তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। অন্যদিকে স্বপ্না আক্তারের মাথায়ও হেলমেট থাকলেও তার হাতে হাতকড়া ছিল না। তাকে কাঠগড়ার ভেতরে একটি প্লাস্টিকের টুলে বসানো হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণ পাঠ শুরু হতেই আদালতকক্ষে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। পুরো সময় মাথা নিচু করে বসে ছিলেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। অন্যদিকে সোহেল রানাকে কাঠগড়ায় নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মাঝেমধ্যে তাকে বিড়বিড় করে কিছু বলতে দেখা যায়। কাছাকাছি থাকা আইনজীবীদের ভাষ্য, তিনি দোয়া-দরুদ পড়ছিলেন। কখনো তাকে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াতেও দেখা যায়।

স্বপ্না আক্তারের চেহারায় ছিল স্পষ্ট বিষণœতার ছাপ। কয়েকবার তাকে চোখ মুছতেও দেখা গেছে। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণ পাঠের পুরো সময়ই তিনি নীরব ছিলেন।

অবশেষে রোববার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে বিচারক দুই আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-ের রায় ঘোষণা করেন। রায়ের সঙ্গে সঙ্গে আদালতকক্ষে উপস্থিত আইনজীবীদের একটি অংশ হাততালি দিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। আদালতের বাইরেও উপস্থিত অনেকের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়।

রায়ে আদালত সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদ-ের পাশাপাশি যথাক্রমে পাঁচ লাখ ও দুই লাখ টাকা অর্থদ- দেন। জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগী রামিসার উত্তরাধিকারীদের প্রদান করার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রয়োজন হলে আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ আদায়ের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন আদালত।

রায় ঘোষণার পর সাজা পরোয়ানা জারি করে দুই আসামিকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। এ সময়ও কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের প্রিজন ভ্যানে তোলা হয় এবং কারাগারের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।

রায় ঘোষণার পর রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, মাননীয় বিচারপতি যে রায় দিয়েছেন, সেই রায়ের প্রতি আমি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান প্রধানমন্ত্রী যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, সেই সময়ের ভেতরে আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। এখন দ্রুত রায় কার্যকর দেখতে চাই। তিনি বিচারক, তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং দেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর পর মাত্র ৫ কার্যদিবসে রায় ঘোষণা করলেন আদালত। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে রায় ঘোষণা করা এটাই প্রথম। এমন দাবি করেছেন বিচার ও আইন-সংশ্লিষ্টরা। 

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, রামিসার পরিবার ন্যায়বিচার পেয়েছে। আমরা রায়ে সন্তুষ্ট। অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহও রায়ের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, অপরাধের বিচার হয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, রামিসার লাশ উদ্ধারের মাত্র ২০ দিনের মাথায় মামলার রায় হলো। অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্কসহ পুরো বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে। বিচার সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ইতিহাসে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এটি অন্যতম দ্রুততম নজির। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, সময় বিবেচনায় এটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তদন্ত থেকে রায় পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।

রায়ের পর সচিবালয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি দ্রুত সম্পন্ন হলে আগামী তিন মাসের মধ্যেই রায় কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উচ্চ আদালতেও এ রায় বহাল থাকবে।

একই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানি দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে। তিনি বলেন, জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার সম্পন্ন হওয়া বাংলাদেশের বিচার ও তদন্ত ইতিহাসে একটি মাইলফলক।

পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশন এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। আসামি সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন। গত ১৯ মে দুপুরে সোহেলদের বাসা থেকে রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ সেখান থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেন সোহেল। লাশ গুম করার জন্য সোহেল রামিসার মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান।

রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ঘটনার দিনই দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। পরদিন সোহেল দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আর স্বপ্নাকেও পাঠানো হয় কারাগারে।
ধর্ষণ ও হত্যার নৃশংস ঘটনাটি সারা দেশে ক্ষোভের জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাসায় গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। আশ্বাস দেন, বিচার দ্রুত শেষ করার।

ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ২৪ মে দুপুরে সোহেল ও স্বপ্নার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই মো. অহিদুজ্জামান। সেদিনই বিচারের জন্য প্রস্তুত করে মামলার নথিপত্র ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।

মামলার বিচারকাজ চালিয়ে নিতে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের অবকাশকালীন ছুটি বাতিল করা হয়। আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে ১ জুন বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। পরদিন সকালে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। একদিনেই ১৬ জনের সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়। ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি হয়। বিচারক সেদিন আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং ১৬ জনের সাক্ষ্য পড়ে শোনান। বিচারক তাদের কাছে জানতে চান, তারা দোষী না নির্দোষ। উত্তরে স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তবে সোহেল রানা ক্ষমা চান। বলেন, স্যার, আমি নির্দোষ। খালাস চাই। পরদিন ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে দুই পক্ষ। রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ- চান। অন্যদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ আসামিদের লঘুদ- প্রার্থনা করেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে সোহেল রানার দেওয়া জবানবন্দি পড়ে শোনান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দুলু। সেখানে উঠে আসে, সোহেলকে পালানোর সুযোগ করে দিয়েই সেদিন রুমের দরজা খোলেন স্বপ্না।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!