টানা চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আগামী অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার আশা করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। ক্ষমতায় বসার চার মাসের মাথায় বাজেট দিতে এসে বৃহস্পতিবার এই লক্ষ্যের কথা জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই লক্ষ্য কীভাবে ধরা দেবে কিংবা সাধারণের ওপর থেকে এই বোঝা কীভাবে কমানো হবে, তার পরিকল্পনা জানাতে গিয়ে বাজেট বক্তৃতায় অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে নতুন কিছু তিনি বলেননি।
আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার ব্যাপক অবচিতি এবং উচ্চ বিনিময় হার দেশে মূল্যস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। এজন্য একটি স্থিতিশীল মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা বজায় রাখতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণে জোর দেওয়া হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত রাখা হবে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ যাতে বিঘিœত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা হবে। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা থেকে শুরু করে বাজারে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করার মতো নানা পদক্ষেপ গত চার বছরে সরকার নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমেনি। কোনো মাসে একটু কমলেও পরের মাসেই ফের চড়ে যাচ্ছে। যার উদাহরণ সবশেষ চার মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র। মূল্যস্ফীতি তখন ঘটে, যখন সময়ের সঙ্গে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। অর্থাৎ, টাকার মান কমে যায়। এই মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করে চলেছে। পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে; কোনো কোনো পণ্যের আমদানি শুল্ক শূন্যও করা হয়েছে।
দেড় বছরের বেশি সময় ধরে নীতি সুদহার (পলিসি রেট বা রেপো রেট) ১০ শতাংশ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতেই রেপো রেট বার বার বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দুই মাসে তিন দফায় ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাগে আসছে না। এমন প্রেক্ষাপটেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দিলেন অর্থমন্ত্রী।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে ১৬ মাসের সর্বোচ্চ হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। পয়েন্ট টু পয়েন্টে ভিত্তিতে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ সার্বিক মূল্যস্ফীতির মানে হলো, গত বছর মে মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় মিলেছে, তা চলতি বছরের মে মাসে পেতে খরচ করতে হয়েছে ১০৯ টাকা ৪২ পয়সা। দেশে বর্তমানে মূল্যস্ফীতির যে পারদ, তা বাড়তে থাকে মূলত কোভিড মহামারির ধাক্কায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসাবে মহামারির পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধকেও সামনে আনে। কিন্তু কোনো কোনো বিশ্লেষক এবং সরকারবিরোধী অনেক রাজনীতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের হাত থাকার কথাও বলেন। চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রায় দেড় বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এ সময়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও গভর্নর আহসান এইচ মনসুর একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছিলেন মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসার কারণ হিসেবে অবশ্য সরকারের সঙ্গে ‘সমন্বয়হীনতার’ কথা বলেন তৎকালীন গভর্নর। গেল ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তিনি বলেন, মুদ্রানীতির শুধু মূল্যস্ফীতি ছাড়া বাকিগুলো কিন্তু অর্জন হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক কিছু ‘ধীরে হয়’ মন্তব্য করে গভর্নর বলেন, এখানে মার্কেট পলিসির সঙ্গে রাজস্ব নীতির একটা সমন্বয় হতে হয়। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় না হওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন হচ্ছে না সেভাবে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছিল। ওই বাজেটের এক মাস যেতেই পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের; বাজেট বাস্তবায়ন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ১০ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছর। পাঁচ বছর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য দুই শতাংশে ওঠে। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষ হয় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ নিয়ে। বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে রাখার লক্ষ্য ধরে অন্তর্বর্তী সরকার। এপ্রিল পর্যন্ত (২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালে এপ্রিল) হিসাবে ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ গড় মূল্যস্ফীতির তথ্য দিয়েছে পরিসংখ্যান ব্যুরো। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য শোনালেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রত্যাশিত নয়, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও একধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা।

