ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

বেনজীরকে আনতে আরব আমিরাতকে দুদকের চিঠি

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬, ০২:৩৩ এএম

সংযুক্ত আরব আমিরাতে (দুবাই) গ্রেপ্তার পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল মঙ্গলবার ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বাংলাদেশ (এনসিবি) শাখায় কর্মরত পুলিশ সদর দপ্তরের দুজন কর্মকর্তা দুদকে যান। সেখানে তাদের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিয়ে বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চিঠি দেয় দুদক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ওই চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলে সহযোগিতা চায় দুদক। ইন্টারপোল বাংলাদেশ থেকে আবেদন ইন্টারপোল সদর দপ্তরে পাঠানোর পর রেড নোটিশ জারি করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ জুন তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত হয় দুদক। গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ একটি চিঠি গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ওই চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার কথা। পরবর্তী পদক্ষেপ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আরব আমিরাত সরকারের মাধ্যমে ইন্টারপোল আরব আমিরাত শাখায় যাবে।

দুদকের এ কর্মকর্তা জানান, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে এনসিবি বাংলাদেশের দুই প্রতিনিধি গতকাল মঙ্গলবার দুদক কার্যালয়ে যান। সেখানে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, আদালতের আদেশ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে আলোচনা হয়। তারা নথিপত্র এবং চিঠি পাঠানোর বিষয়টি কতদূর এগিয়েছে সেগুলো নিয়ে দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলাগুলোর তথ্য-উপাত্ত, আদালতের আদেশ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি এনসিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বেনজীরকে দেশে ফেরত পাঠাতে দুদকের পক্ষ থেকে দেওয়া অনুরোধসহ চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হওয়া দুর্নীতির একাধিক মামলার আসামি ও সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করেছে তারা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়া উদ্দিন আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, গতকাল পর্যন্ত তার শাখা দুদকের চিঠি হাতে পাননি। হয়তো সেটি মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। তাদের দপ্তরে চিঠি আসার পর রাজনৈতিক শাখা থেকে ওই চিঠি ও বেনজীরের বিরুদ্ধে মামলার নথিপত্র, আদালতের আদেশ ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তারা পাঠাবেন। পরবর্তী পদক্ষেপ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নেওয়া হবে।

দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে দুদকের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হবে।

এদিকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম, খুন ও গণহত্যার অন্তত ১০টি মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এনসিবি ও ইন্টারপোলের মাধ্যমে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও শুরু করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। গত সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার, তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা, ধরন এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তার (বেনজীর) বিরুদ্ধে আমাদের এখানে প্রায় ১০টির মতো মামলা। আমরা ইনভেস্টিগেশন করে যাচ্ছি এবং প্রত্যেকটার সঙ্গে তার কানেকশন আছে। তিনি যখন র‌্যাবের প্রধান ছিলেন, তখন গুমের সঙ্গে যেগুলো (মামলা) অলরেডি চলমান আছে, তার মধ্যে বিচার চলছে।’ বেনজীর শাপলা চত্বরের ঘটনার ‘অন্যতম কুশীলব’। তার বিরুদ্ধে আমাদের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। চট্টগ্রামের একরাম কমিশনার হত্যাকা-, তার সঙ্গেও তার সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল, সেখানেও তিনি আছেন। আরও অন্তত ৭ থেকে ১০টি মামলার তদন্ত চলমান আছে, যেগুলোর প্রত্যেকটার মধ্যে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে।’ সাবেক এই আইজিপিকে ফিরিয়ে আনতে ট্রাইব্যুনালের ওয়ারেন্টের কপি ইতোমধ্যে পুলিশের বিশেষ শাখা এনসিবিতে পাঠানো হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকলেও কূটনৈতিক চ্যানেলে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব জানিয়ে প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যে কয়টি ওয়ারেন্ট আছে, সেগুলো দিয়ে সরকার ইতোমধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আরব আমিরাত সরকারের কাছে আবেদন করেছে, তাকে বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার জন্য এবং ওখানকার একটা প্রসিডিউর আছে যে, তাদের ৩০ দিনের মধ্যে আমরা যখন কোনো এক্সট্রাডিশনের আবেদন করা হয়, সেখানকার প্রসিকিউটরের কাছে সেটা উপস্থাপন করা হয়, প্রসিকিউটর এটা আপিল আকারে তাদের আদালতে উপস্থাপন করে, আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে সেই বন্দিকে ফেরত পাঠানো হয়।

সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলাম এনসিবির কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘রেড নোটিশ তো আসলে ইন্টারপোলের একটা ফাংশন। আমাদের এখানে একটা ব্যুরো আছে, এটাকে বলে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো, এনসিবি। এটা চালায় আমাদের পুলিশের লোকেরাই, বাংলাদেশ পুলিশের লোকেরাই। কিন্তু কমিউনিকেশনগুলো হয় সব ইন্টারপোলের সঙ্গে। তো এখান থেকেই আমরা আসলে রেড নোটিশের আবেদনগুলো পাঠাই ইন্টারপোলের হেডকোয়ার্টারে। ‘ইন্টারপোলের কাজ শেষ। এরপর ওইটার প্রেক্ষিতে আরব আমিরাতের ইন্টারপোলের যে শাখা, তারা ওখানকার লোকাল পুলিশ, মানে দুবাই পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করেছে। এর আগেও তো আরব আমিরাত থেকে খুনের মামলার আসামি এলো। ওখানকার পুলিশ তারা অ্যারেস্ট করেছে, আমাদের জানিয়েছে। আমাদের ওখান থেকে সিআইডি থেকে পুলিশ অফিসার গিয়ে বাংলাদেশের তাকে নিয়ে আসছে।

চুক্তি না থাকার বিষয়ে সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এক্সট্রাডিশন চুক্তি আরব আমিরাতের সঙ্গে নাই। ভারতের ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে আছে। কিন্তু ওটা যে থাকতেই হবে, নট নেসেসারি। ওইটা থাকলে ইজি হতো। কিন্তু দুই দেশের গভর্নমেন্ট পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমেই তাকে নিয়ে আসতে পারে।’

প্রসঙ্গত, দুর্নীতি দমন কমিশনে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও পাসপোর্ট জালিয়াতির দুটি মামলার নথিপত্র দিয়ে সাবেক এ আইজিপিকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চায় দুদক। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ইন্টারপোল বাংলাদেশ শাখা থেকে চিঠি পাঠানো হয় সদর দপ্তরে। পরে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়। গত ১২ জুন বেনজীর আহমেদকে ওই রেড নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার করে সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ। বর্তমানে বেনজীর আহমেদ আরব আমিরাত পুলিশের ইন্টারপোল শাখা হেফাজতে রয়েছে।