খেলার মাঠের সীমানা পেরিয়ে জার্সি আজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি জনপ্রিয় পোশাকে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা বিভিন্ন ক্লাব প্রতিযোগিতার সময় প্রিয় দল বা খেলোয়াড়ের জার্সি পরিধান করা অনেকের কাছে আবেগ, ভালোবাসা ও সমর্থনের প্রতীক। তরুণদের পাশাপাশি সব বয়সি মানুষের কাছেই জার্সির জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু একজন সচেতন মুসলমানের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, জার্সি পরে নামাজ আদায় করা কি বৈধ? জার্সিতে প্রাণীর ছবি, মানুষের প্রতিকৃতি বা ক্রসচিহ্ন থাকলে তার বিধান কী? আর এ ধরনের জার্সির ব্যবসা করা ইসলামের দৃষ্টিতে কতটুকু গ্রহণযোগ্য?
ইসলাম পোশাকের ক্ষেত্রে শালীনতা, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। নামাজ আদায়ের জন্য পোশাক পাক-পবিত্র হওয়া, সতর যথাযথভাবে আবৃত রাখা এবং শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় থেকে মুক্ত থাকা অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ করো।’ (সুরা আরাফ : ৩১)। মুফাসসিরগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, নামাজের সময় পরিচ্ছন্ন, মার্জিত ও শালীন পোশাক পরিধান করা ইসলামী আদবের অংশ এবং তা মুস্তাহাব।
এ দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণ জার্সি পরিধান করে নামাজ আদায়ে কোনো বাধা নেই। কারণ জার্সি নিজেই কোনো হারাম বা নিষিদ্ধ পোশাক নয়। যদি তা পবিত্র হয়, সতর আবৃত রাখে এবং শরিয়ত নিষিদ্ধ কোনো বিষয় থেকে মুক্ত থাকে, তাহলে তা পরে নামাজ আদায় করলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে বর্তমানে প্রচলিত অনেক জার্সিতে বিভিন্ন প্রাণীর ছবি, মানুষের প্রতিকৃতি বা বিশেষ প্রতীক ব্যবহার করা হয়, যা নিয়ে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।
ফিকহবিদগণ উল্লেখ করেছেন, যদি পোশাকে এমন প্রাণীর ছবি থাকে যার মুখম-ল ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়, তাহলে তা পরিধান করা মাকরূহ। এ ধরনের পোশাক পরে নামাজ আদায় করাও মাকরূহ হলেও নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায় এবং পুনরায় আদায়ের প্রয়োজন হয় না। খোলাসাতুল ফতোয়া ও আল-মুহিতুল বুরহানিসহ বিভিন্ন ফিকহগ্রন্থে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা পাওয়া যায়। ইসলামে ছবি সম্পর্কে সতর্কতার বিষয়টিও হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ঘরে ছবি থাকে, সে ঘরে ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩২২৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১০৬)। এ কারণে একজন মুসলমানের জন্য ছবি-মুক্ত পোশাক বেছে নেওয়াই অধিক সতর্কতা ও তাকওয়ার পরিচায়ক।
শুধু ছবিই নয়, বর্তমান সময়ে অনেক আন্তর্জাতিক ক্লাব, জাতীয় দল কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোগোতে ক্রসচিহ্নও দেখা যায়। ক্রস খ্রিষ্টধর্মের একটি সুপরিচিত ধর্মীয় প্রতীক। ইসলামে এ ধরনের ধর্মীয় প্রতীকের প্রতি অনুকরণ বা সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা রয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ঘরে কোনো ক্রসচিহ্নযুক্ত বস্তু দেখলে তা অপসারণ করে দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৫২)। এ হাদিসের আলোকে আলেমগণ বলেন, সুস্পষ্ট ক্রসচিহ্নযুক্ত পোশাক বা জার্সি পরিহার করাই উত্তম এবং তা পরে নামাজ আদায় করাও অপছন্দনীয়।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ছবিযুক্ত বা ক্রসচিহ্নযুক্ত জার্সির ব্যবসা করা কি বৈধ? ইসলামি আইনশাস্ত্রে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। ফকিহদের মতে, এ ধরনের জার্সি বিক্রি সরাসরি হারাম না হলেও তা মাকরূহ বা অনুৎসাহিত। কারণ এর মাধ্যমে এমন বিষয়ের প্রসার ঘটে, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়িদাহ : ২)। তাই এমন পণ্যের ব্যবসা, যা শরিয়তবিরোধী বিষয়কে উৎসাহিত করে, তা থেকে বিরত থাকাই অধিক নিরাপদ।
তবে যদি কোনো ব্যবসায়ী ছবি-মুক্ত, ক্রস-মুক্ত, অশ্লীল সেøাগানবিহীন এবং ইসলামবিরোধী প্রতীকবর্জিত জার্সির ব্যবসা করেন, তাহলে সে ব্যবসা মূলত হালাল ব্যবসার অন্তর্ভুক্ত হবে। একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর জন্য শুধু আর্থিক লাভ নয়, বরং হালাল ও পবিত্র উপার্জনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ ইসলামে উপার্জনের পবিত্রতা একজন মুমিনের ইবাদত কবুল হওয়ার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
অতএব, জার্সি পরিধান করা ইসলামে অবৈধ নয় এবং সাধারণ জার্সি পরে নামাজ আদায় করলে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়। তবে প্রাণীর সুস্পষ্ট ছবি, মানুষের প্রতিকৃতি কিংবা ক্রসচিহ্নযুক্ত জার্সি পরিধান করা ও তা পরে নামাজ আদায় করা থেকে বিরত থাকাই অধিক উত্তম। একইভাবে এ ধরনের জার্সির ব্যবসা সরাসরি হারাম না হলেও তা পরিহার করে সন্দেহমুক্ত ও শরিয়তসম্মত ব্যবসার পথ বেছে নেওয়াই একজন সচেতন মুসলমানের জন্য অধিক নিরাপদ ও প্রশংসনীয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন, উত্তম আমল এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

