ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

ডিগ্রি বাড়ছে, কর্মসংস্থান কমছে /শিক্ষিত বেকারত্বের ক্রমবর্ধমান সংকট

নিশিত কুমার বিশ্বাস, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬, ০৩:৪৫ এএম

একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো শিক্ষা। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৭০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রতি বছর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করছে এবং বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষার বিস্তার যত দ্রুত ঘটছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তত দ্রুত বাড়ছে না। ফলে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘ডিগ্রি বাড়ছে, কর্মসংস্থান কমছে’Ñ এটি এখন শুধু একটি আলোচনার বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি কঠিন প্রতিচ্ছবি।

একসময় ডিগ্রি ছিল চাকরির নিশ্চয়তার প্রতীক। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় শুধুমাত্র একটি সনদ আর কর্মজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও তাদের একটি বড় অংশ কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান খুঁজে পায় না। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও অনেক তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকে। কেউ একের পর এক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়, আবার কেউ দীর্ঘ হতাশার কারণে কর্মজীবনের স্বপ্নই ত্যাগ করে।

এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলোÑ শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে অসামঞ্জস্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনো মুখস্থনির্ভর। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনের লক্ষ্যে পড়াশোনা করে, কিন্তু বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত থাকে। ফলে ডিগ্রি থাকলেও চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না।

বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, রোবটিক্স, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং বিভিন্ন কারিগরি দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অথচ দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে শিক্ষার্থীরা আধুনিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে, দেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতিকে ‘ঔড়নষবংং এৎড়ঃিয’ বা ‘চাকরিবিহীন প্রবৃদ্ধি’ বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ জাতীয় উৎপাদন ও জিডিপি বাড়লেও নতুন চাকরির সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান কম জনবল দিয়েই অধিক কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। একই সঙ্গে শিল্পায়নের গতি ও বেসরকারি বিনিয়োগও অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো চাকরি সম্পর্কে তরুণদের প্রচলিত মানসিকতা। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো সরকারি চাকরিকে সবচেয়ে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে লাখ লাখ তরুণ বিসিএস, ব্যাংক, শিক্ষকতা কিংবা অন্যান্য সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে বছরের পর বছর সময় ব্যয় করে। কিন্তু সরকারি চাকরির সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি সফল হলেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ বেকার থেকে যায়।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম এবং শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে এমন বিষয়বস্তু পড়ানো হয়, যার সঙ্গে আধুনিক কর্মবাজারের সরাসরি সম্পর্ক খুবই কম। ফলে ডিগ্রি অর্জনের পর বাস্তব কর্মক্ষেত্রে নিজেদের মানিয়ে নিতে শিক্ষার্থীরা হিমশিম খায়। অনেক নিয়োগদাতা অভিযোগ করেন, নতুন স্নাতকদের মধ্যে যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।

এই পরিস্থিতির সামাজিক প্রভাবও গভীর ও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন বেকার থাকার কারণে অনেক তরুণ হতাশা, মানসিক চাপ এবং আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগছে। পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যয় করা অর্থের প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় পরিবারগুলোও হতাশ হয়ে পড়ছে। অনেক তরুণ উন্নত সুযোগের আশায় বিদেশমুখী হচ্ছে, আবার কেউ কেউ নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় নি¤œমানের কাজে নিয়োজিত হতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ব্যবহারিক শিক্ষা, গবেষণা, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। তৃতীয়ত, উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং স্টার্টআপ সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং সম্ভাব্য চাকরিদাতা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করাও জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, কেবল ডিগ্রির সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো জাতির উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না। শিক্ষা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা দক্ষতা সৃষ্টি করে, উদ্ভাবনী চিন্তাকে উৎসাহিত করে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। আজকের বাস্তবতায় ডিগ্রির পাশাপাশি দক্ষতা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং কর্মমুখী শিক্ষা অপরিহার্য। অন্যথায় ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষিত বেকারের দীর্ঘ সারি আরও দীর্ঘ হবে। তাই সময়ের দাবি হলোÑ শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতাকেন্দ্রিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানমুখী উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের সম্ভাবনাকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করা।