গত প্রায় দেড় বছর স্বাস্থ্য খাতের কোনো অপারেশন প্ল্যান না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ইউনিসেফকে হামের টিকা কিনতে টাকা দেওয়া হয়নি। ফলাফল, বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মাথায় দেশে হামের তীব্রতা শুরু হতে থাকে। এর মধ্যে সরকার টিকা কিনে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি পালন করলেও কোনোমতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না রোগটি। মাত্র তিন মাসে হামের উপসর্গ ও সংক্রমণে প্রাণ গেছে ৬৫৭ শিশুর। এদিকে বর্ষাকালের আগেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গুও। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে প্রাণ গেছে একজনের। এমন পরিস্থিতিতে হাম-ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও তৎপর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও সরকার ‘হাম নির্দেশিকা’ প্রকাশ করেছে মাত্র, কিন্তু ‘ডেঙ্গু নির্দেশিকা’ আগে থেকে থাকলেও সেটির ঠিকমতো ব্যবহার হচ্ছে না বলে দাবি তাদের। তাই দুটি রোগই মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগে সমন্বিতভাবে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ তাদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল মঙ্গলবার দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে এক শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে মাত্র তিন মাসের মাথায় নির্মমভাবে মৃত্যু হয়েছে ৬৫৭ নিষ্পাপ শিশুর। শুধু তাই নয়, এই সময়ের মধ্যে সারা দেশে ৭২ হাজার ৪০৫ শিশু হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। একই দিনে ডেঙ্গুতেও মারা গেছে এক শিশু। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৪১২ জন। এমন পরিস্থিতিতে সরকার সমন্বিতভাবে হাম-ডেঙ্গু মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
টিকা কার্যক্রম তিন মাসে পড়লেও হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরাও। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, এত দিনে সংক্রমণ কমে যাওয়ার কথা ছিল। কেন তা হচ্ছে না, বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। যারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেছে, তারা টিকা পেয়েছে। এখন ‘মাইক্রোপ্ল্যান’ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি, তাদের আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করায় মৃত্যুহার কমছে না। আক্রান্ত শিশুদের শুরুতেই আইসোলেশনে রাখা, মাঝারি পর্যায়ে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিসেবা জোরদার করা জরুরি। শুধু আইসিইউ-নির্ভর চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যু কমানো যাবে না। রোগের শুরু থেকেই সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আইসোলেশন, অক্সিজেন ও পুষ্টিÑ এই তিন বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা সরকারের এখনই করতে হবে।
এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছিলেন, গত সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা দেওয়ার কর্মসূচি হয়নি। ফলে নবজাতকসহ যারা হামের টিকা আওতার বাইরে থেকে যায়, তারাই এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে দাতা সংস্থার সহায়তায় ১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) চালু করে বাংলাদেশ সরকার। পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি স্বাস্থ্য খাতের কর্মীদের কাছে ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ নামে বেশি পরিচিত। এটি বাস্তবায়ন করা হতো অপারেশন প্ল্যান (ওপি) তথা বিষয়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে। সেক্টর প্রোগ্রামের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য কার্যক্রমের আওতায় এত দিন সারা দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) পরিচালিত হতো। এ ক্ষেত্রে টিকার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব সংস্থা গ্যাভির আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ এত দিন টিকা কিনত ইউনিসেফের মাধ্যমে। ২০২২ সালে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারিসহ নানান কারণে সেটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আনা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষমতায় আসে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এ সময় বিভিন্ন খাতে সংস্কার নিয়ে নানান আলোচনার মধ্যে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিয়ে নিজেরা টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু মূলত কোনো অপারেশন প্ল্যানই ছিল না এই সরকারের। এর ফলেই বর্তমান এই পরিস্থিতি বলেও মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে খুব শিগগিরই হাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে আশা করে তিনি বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচি আমাদের চলমান রয়েছে। হামে আক্রান্তের সংখ্যাও এখন তুলনামূলক কম। তবে আমাদের আশঙ্কা ডেঙ্গু নিয়ে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। সাধারণ মানুষের সহযোগিতা নিয়ে ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে চাই। কোনো বাসা-বাড়িতে যদি জমানো পানি থাকে, তাহলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেব। এ ছাড়া ঢাকার দুই সিটির সঙ্গেও আমরা আলোচনা করেছি। মশা নিধন কর্মসূচি পালনে কেউ যদি গাফিলতি করে, তাহলে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, টিকাদান কর্মসূচির কারণে দেশে একসময় হামের প্রকোপ কমে এলেও চলতি বছর তা আবার বেড়েছে। গত ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় এবং ১০ জানুয়ারি সেখানে সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি এলাকায়ও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি, যাদের বড় অংশই হামে আক্রান্ত শিশু।
এসব বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ^াস রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ ভঙ্গুর একটা স্বাস্থ্যব্যবস্থা পেয়েছি। হঠাৎ করে হামের এই ঊর্ধ্বগতি আমাদের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কিছুদিনের মাথায় আমাদের একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। তবে আমরা তা মোকাবিলার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি চলছে। ঢাকার ডিএনসিসির বিভিন্ন ওয়ার্ড, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি হচ্ছে না।’ কিন্তু মৃত্যুর কারণ দেরিতে হাসপাতালে আসা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কারো জ¦র উঠলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দেরি করা যাবে না। ডেঙ্গুই হোক বা হামÑ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। হামের ক্ষেত্রে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রেও সচেতনতার বিকল্প নেই।’

