ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

‘ভারত-চীন বিতর্ক’ এড়াতে প্রথম গন্তব্য মালয়েশিয়া

রুবেল রহমান
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম

সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১২০ দিনে দেশে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। আগামী ২১ জুন ছয় দিনের একজোড়া গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা ছাড়বেন তিনি। প্রথম দফায় ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন এবং এরপর ২৩ জুন কুয়ালালামপুর থেকেই সরাসরি চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন। ২৬ জুন তার ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক মহলে ও কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনÑ উভয় দেশের পক্ষ থেকে প্রথম সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কৌশলগত কারণে তৃতীয় একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে মালয়েশিয়াকে তার প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই দ্বিপাক্ষিক সফর সফল করতে ইতিমধ্যে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জোর প্রস্তুতি চলছে। সফরের খুঁটিনাটি ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম ইতিমধ্যে বেইজিং সফর করে চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

কেন প্রথম গন্তব্য মালয়েশিয়া? : কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মধ্যে চলমান তীব্র কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো একটি দেশকে প্রথম সফরের জন্য বেছে নিলে অন্য পক্ষের কাছে ভুল বার্তা যাওয়ার ঝুঁকি থাকত। সেই ‘ভারত-চীন বিতর্ক’ এড়াতে এবং সম্পর্কে ভারসাম্যের বার্তা দিতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরের জন্য কুয়ালালামপুরকে বেছে নিয়েছেন।

তা ছাড়া ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একধরনের শীতলতা তৈরি হয়েছিল, যা কাটিয়ে উঠতে দুই পক্ষই কাজ করছে। এর মধ্যে গত জানুয়ারিতে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে শেষ শ্রদ্ধা জানান এবং নরেন্দ্র মোদি শোকবার্তা পাঠান। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই চীন বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী সরকার এবং বিএনপি-জামায়াতসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্রুত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আঞ্চলিক রাজনীতি বিশ্লেষক মো. ফরিদ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিনিয়োগ ও শ্রমবাজারের দিক থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অত্যন্ত পরীক্ষিত বন্ধু। আবার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশটির অবস্থান বেশ নিরপেক্ষ। দুই শক্তিধর দেশ ভারত ও চীনের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী কুয়ালালামপুরকে বেছে নিয়েছেন, যা একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত।’

মালয়েশিয়া সফরে মূল ফোকাস শ্রমবাজার ও জনশক্তি : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হবে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে। বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির অন্যতম শীর্ষ বাজার মালয়েশিয়া হলেও সিন্ডিকেট চক্র ও নানা জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। গত এপ্রিলে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন কুয়ালালামপুর সফর করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মালয়েশিয়া সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।

সম্প্রতি ঢাকায় এক বৈঠক শেষে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় খোলার এবং সেখানে থাকা অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে।’ শ্রমবাজারের পাশাপাশি শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দেশটিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও প্রসারিত হবে।

চীন সফরে নজর মেগা প্রকল্প ও ৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ : মালয়েশিয়ার সফর শেষে ২৩ জুন বেইজিংয়ে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বেইজিং সফরের আগে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিইএফ) একটি কর্মসূচিতেও অংশ নিতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক অংশীদারি, প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে ১৫টির মতো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার আভাস মিলেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই সফরে কয়েকটি মেগা প্রকল্পের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবেÑ প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, যমুনা নদীতে আরেকটি সেতু নির্মাণ, চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা।

সম্প্রতি একনেক সভায় চীনের ঋণে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর চলাকালীন বেইজিংয়ে একটি বিশেষ ‘বিনিয়োগ সম্মেলন’ আয়োজনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া, বাংলাদেশের বাজারে চীনা মুদ্রায় বন্ড চালু, বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) নির্মাণে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে চীনের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হবে। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক স্থাপনের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।

উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ও সম্পর্কের নতুন উচ্চতা : প্রধানমন্ত্রীর এই বহরে সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সঙ্গী হচ্ছে। সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম দেশের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এবং তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। এ ছাড়া প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীসহ আরও বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর এই সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেছেন, ‘শুরুতে ভারতের নাম শোনা গেলেও মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে। চীন সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী কোথায় গেলেন, তা নিয়ে বেইজিং মাথা ঘামায় না। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখা আমাদের নিজস্ব স্বার্থেই প্রয়োজন। আশা করা যায়, এই সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন গতি আসবে।’ আগামী ২৬ জুন সফর শেষে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দ্বিপক্ষীয় সফর বাংলাদেশের জন্য বন্ধ শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।