তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর অবশেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারকে (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) সই করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মাসুদ পেজেশকিয়ান স্বাক্ষরিত এই সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি এমন সমঝোতা হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে- এটি কি কেবল যুদ্ধবিরতি, নাকি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা? এদিকে চুক্তি সইয়ের পরপরই হুঁশিয়ারি এসেছে মার্কিন তরফ থেকে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, চুক্তি অনুযায়ী তেহরান প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে ও কঠোর অবরোধ আরোপে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সে সময়ই দুই দেশ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করবে বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু এর আগেই গত বুধবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভার্সাই প্রাসাদে এই সমঝোতায় সই করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অন্যদিকে ইরানে বসে চুক্তিতে সই করেন পেজেশকিয়ান। অনলাইনে উভয় নেতা তাদের চুক্তি স্বাক্ষরের কপি দেখান। এর ফলে আজকের বৈঠক আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সমঝোতা অনুযায়ী, অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা হবে এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে বিস্তারিত আলোচনা চলবে। সমঝোতা স্মারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ইরানের ওপর আরোপিত বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রক্রিয়া শুরু করা।
এর খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সহায়তার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে ইরানের আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সম্পদ উন্মুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা এগোবে। এসব বিষয়ে বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘এটি আরও বেশি সময় নিতে পারে।’
ইরানের বড় অর্জন
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, সামরিক সংঘাতের চেয়ে আলোচনার টেবিলে ইরান বেশি সুবিধা আদায় করেছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবফ বলেছেন, সামরিক পদক্ষেপে যা অর্জন সম্ভব ছিল, আলোচনার মাধ্যমে তার চেয়েও বেশি পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার বিষয়টি তেহরানের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুদ্ধ চলাকালে এই জলপথ ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তোলে। সমঝোতার পর এরই মধ্যে ইরানের একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
ইরানের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত বাধা তুলে নেওয়া, বিদেশে জব্দ সম্পদ ফেরত পাওয়া এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। নতুন সমঝোতা সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সম্পদ
বিদেশে ইরানের ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি সম্পদ আটকে রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বড় অংশ রয়েছে চীনে। এ ছাড়া ইরাক, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, জাপান, ওমান ও অন্যান্য দেশেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আটকে আছে।
ইরান অন্তত দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলার দ্রুত ছাড়ের দাবি জানিয়েছে। এই অর্থ দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত দেশটির জন্য এটি হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি।
পারমাণবিক প্রশ্নে সমঝোতা
সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারমাণবিক কর্মসূচি। খসড়ায় বলা হয়েছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং ভবিষ্যতে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত থাকবে এবং বিদ্যমান কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার পথ তৈরি করবে। তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো স্পষ্ট লিখিত শর্ত না থাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
চুক্তি স্বাক্ষরের পরও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরান যদি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে, তা হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। তিনি বলেছেন, আইনি ব্যবস্থার পরিবর্তে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করা হবে। অন্যদিকে ইরানও বলছে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চুক্তি বাস্তবে কার্যকর হয় কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা।
তথ্য অনুসারে, আগামীতে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান, কাতার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে স্থায়ী চুক্তির কাঠামো, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি
স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী তেহরান তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন পুনরায় সামরিক অভিযান চালাতে এবং কঠোর অবরোধ আরোপ করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
হেগসেথ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ইরান যদি তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদক্ষেপ না নেয়, তা হলে আমরা পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত থাকব।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরান চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে তাদের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর ও কার্যকর অবরোধ আরোপ করা সম্ভব।’ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ- উভয়ই মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে।
হেগসেথ বলেন, হরমুজ প্রণালি মাইনমুক্ত করার উদ্যোগে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে। এ সময় যুক্তরাজ্যের প্রতি আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘যুক্তরাজ্যকে আরও এগিয়ে আসতে হবে, আরও বড় ভূমিকা রাখতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে আরও বেশি ব্যয় করতে হবে।’
বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণ
এই সংঘাত ও পরবর্তী সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা নতুনভাবে মূল্যায়নের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ইরানও নিজেকে একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষকের অভিমত।
সংঘাতটি দেখিয়েছে যে, আধুনিক যুদ্ধে কেবল সামরিক শক্তির পরিমাণ নয়, কৌশলগত স্থিতিশীলতা, ড্রোন প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সহনশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা কাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্য
বাংলাদেশের জন্য এই সমঝোতা স্বস্তির খবর। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে জ্বালানি আমদানি, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং বাণিজ্যের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারত। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে উত্তেজনা কমে আসা বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য ইতিবাচক। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হতে পারে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
শান্তির পথে প্রথম ধাপ
সমঝোতা স্মারকটি এখনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নয়; বরং একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা। তবে কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বৈশ্বিক উদ্বেগ এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতার পর এই সমঝোতা একটি বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগামী ৬০ দিনের আলোচনা সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দশকের বৈরিতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। তবে বাস্তবায়নে ব্যর্থতা বা পারস্পরিক অবিশ্বাসের পুনরুত্থান ঘটলে এ অঞ্চল আবারও সংঘাতের দিকে ফিরে যেতে পারে। ফলে এখন বিশ্বের নজর শান্তি প্রতিষ্ঠার ঘোষণার দিকে নয়, বরং সেই শান্তি কতটা বাস্তবে রূপ পায়, তার ওপর।

