ঢাকা শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

সুইজারল্যান্ড বৈঠক স্থগিত

অনিশ্চতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটাতে প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) সই হলেও স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথে নতুন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের প্রতিনিধিদের নির্ধারিত বৈঠক বাতিল হওয়ায় আলোচনার সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

একই সঙ্গে লেবাননে সংঘাতের নতুন করে বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হওয়ার দাবি করেছে লেবানন কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর হামলায় তাদের চার সেনা নিহত হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টদের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধ বন্ধের ভিত্তি তৈরি হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয় পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে অথবা অন্তর্বর্তী চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে।

শেষ মুহূর্তে বাতিল বৈঠক : সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি রিসোর্ট বুর্গেনস্টকে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু করার প্রস্তুতি অনেক দূর এগিয়েছিল। তবে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বৈঠকে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান। এর আগে তেহরানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও বৈঠকে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।

এক বিবৃতিতে সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, আলোচনাটি স্থগিত করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ আলোচনা আয়োজন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

লেবানন ইস্যুতে জটিলতা : শান্তি আলোচনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে লেবানন পরিস্থিতি। অন্তর্বর্তী চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে হবে। এর মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আলোচনার বাইরে থাকা ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা এই চুক্তির অংশ নয়। ফলে লেবাননে সংঘাত অব্যাহত থাকলে শান্তিপ্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিতে নতুন নিয়ম : চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সব জাহাজকে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে যাতায়াত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, আগামী ৬০ দিনের জন্য জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত টোল স্থগিত থাকবে এবং এর ব্যয় ইরান নিজেই বহন করবে। তবে জাহাজগুলোকে ইরানের প্রতিষ্ঠিত নতুন কর্তৃপক্ষ ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’র মাধ্যমে আগাম অনুমতি নিতে হবে। যুদ্ধ চলাকালে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংস্থাটি গঠন করা হয়েছিল।

এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ ও টোলমুক্ত চলাচল নিশ্চিত করা উচিত এবং হরমুজ প্রণালিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার : যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে কার্যকর হতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা চুক্তি। গত বুধবার স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় এখন উভয় দেশ একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে ৬০ দিনের আলোচনায় প্রবেশ করেছে। চুক্তিটির মূল ভিত্তি ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠিত, যার মধ্যে অন্যতম হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা।

যুদ্ধের প্রভাব ও তেলের বাজার : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত সাত হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। নিহতদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবারও তেলবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হওয়ার আশা দেখা দিয়েছে।

ট্রাম্পের সমালোচনা, ইরানের কড়া অবস্থান : ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছেন। অনেকে মনে করছেন, যুদ্ধ বন্ধের জন্য তিনি ইরানকে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন।

গত মার্চে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া যুদ্ধের অবসান হবে না। কিন্তু বর্তমান চুক্তিতে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা এবং তেল রপ্তানিতে ছাড় দেওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এদিকে চুক্তিটির প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘তেলপ্রবাহ আবার শুরু হয়েছে। ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।’ পরে আরেক বার্তায় ট্রাম্প জানান, তিনি আশা করছেন লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, চুক্তিতে নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা বা অর্থ পাবে না।

অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি দাবি করেছেন, ট্রাম্প ‘হতাশা থেকেই’ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি আলোচনায় অতিরিক্ত দাবি চাপিয়ে দিতে চায়, তবে আমরা তা মেনে নেব না।’ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান তার মর্যাদা বিসর্জন দেয়নি। আমাদের কূটনীতি ও জাতীয় দৃঢ়তার ফলেই এই সমঝোতা সম্ভব হয়েছে।’

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদও সতর্ক করে দিয়েছে, চুক্তি লঙ্ঘিত হলে তারা কঠোর জবাব দেবে এবং দেশের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখাবে না।

ইসরায়েল নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান : চুক্তির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনার ইঙ্গিত মিলছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ইসরায়েলের প্রতি আধুনিক ইতিহাসের যেকোনো মার্কিন প্রশাসনের তুলনায় বেশি প্রকাশ্য সমালোচনা করছে। সম্প্রতি ট্রাম্প অভিযোগ করেন, লেবাননে হামলার সময় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরায়েল ‘অতিরিক্ত ও অসম মাত্রার শক্তি’ প্রয়োগ করেছে। অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স ইসরায়েলের উগ্র জাতীয়তাবাদী মন্ত্রীদের উদ্দেশে মন্তব্য করেন, ‘শুধু হত্যা করে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।’ তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে বড় সমালোচক ট্রাম্প নিজেই।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি সফল করতে এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।

সামনে কঠিন আলোচনা : চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এরই মধ্যে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপরও সীমাবদ্ধতা আরোপের চেষ্টা করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সবচেয়ে জটিল ও বিতর্কিত বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ফলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনো দীর্ঘ ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা।