মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে জিততে ড্র করা জনপ্রিয় দল ব্রাজিল খেলেছিল আড়ষ্ট ফুটবল। সমালোচনায় বিদ্ধ কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা দ্বিতীয় ম্যাচে নিজেদের ফিরে পেল। ম্যাথিউস কুনহা আর ভিনিসিউসের ঝলকে পেল প্রত্যাশিত বড় জয়। ফিলাডেলফিয়ায় বিশ্বকাপের ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচ ব্রাজিল জিতেছে ৩-০ গোলে। সবগুলো গোলই হয়েছে প্রথমার্ধে। কুনহার জোড়া গোলের পর ভিনিসিউস বিশ্বকাপে পান নিজের দ্বিতীয় গোলের দেখা। রিয়াল মাদ্রিদ তারকা অবশ্য বাকি ২ গোলেই রেখেছেন ভূমিকা।
হাইতির বিপক্ষে জয় ছিল প্রত্যাশিত। ক্যারিবিয়ান দেশটির বিপক্ষে ১০ বছর আগে সর্বশেষ দেখায় ব্রাজিল জিতেছিল ৭-১ গোলে। শক্তির তফাত তাই স্পষ্ট। কিন্তু মরক্কো ম্যাচের পর ব্রাজিলের এক্সপোজড হওয়া মিডফিল্ড সমর্থকদের দিচ্ছিল না ভরসা। গা ঝাড়া দিয়ে হাইতির বিপক্ষে নিজেদের গর্বের ছন্দ দেখানো ছিল জরুরি। প্রতিপক্ষ দুর্বল হলেও হাইতির বিপক্ষে অন্তত তা করতে পেরেছে। যদিও আরও বেশি গোল না হওয়ার আক্ষেপ থেকেই যাবে।
তবে ব্রাজিলের নাম্বার নাইন পজিশন নিয়ে হাহাকার এদিন আর বাড়েনি। আগের ম্যাচে বিবর্ণ খেলা ইগোর থিয়াগোর বদলে কুনিয়াকে দেওয়া হয় সুযোগ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা প্রথাগত সেন্টার ফরোয়ার্ড নন। তিনি একটু নিচে থেকে বল তৈরি করার কাজটাও করছিলেন। ফলে মিডফিল্ডের কাজটাও সহজ হয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকে আক্রমণ করে খেলতে থাকা ব্রাজিল ১৩ মিনিটে বল জালেও জড়িয়েছিল। ডান প্রান্ত থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণ থেকে দারুণ ফিনিশিং করেছিলেন রাফিনিয়া। কিন্তু অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। মিনিট দশেক পরে রাফিনিয়ার সামনেই আবার এসেছিল সুযোগ, তা হেলায় হারান তিনি।
খানিক পরেই আসে প্রথম গোল। মাঝমাঠ থেকে বলের জোগান পেয়ে ভিনিসিয়ুস বক্সে ঢুকে মারেন শট। ফিরতি বলে জটলার মধ্যে কুনিয়া বল পায়ে লাগিয়ে জালে জড়াতে সক্ষম হন। ৩৭ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ইউনাইটেড তারকা কুনিয়া। এবার তার গোলটি দৃষ্টিনন্দন। নিজেদের অর্ধ থেকে বল কেড়ে আক্রমণ শুরু করেন ডগলাস সান্তোস, ভিনিসিয়ুসের পা ঘুরে সেটা আসে কুনিয়ার কাছে। তীব্র গতিতে ছুটে গিয়ে বাঁ পায়ের দুরন্ত শটে বল জালে জড়ান কুনিয়া।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে লুকাস পাকেতা হাইতির ডিফেন্স লাইনের ওপর দিয়ে আলতো করে বল বাড়িয়ে দেন, যার চমৎকার সুবিধা নেন ভিনিসিয়ুস। তিনি বাম প্রান্ত দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে চিপ করে জালে জড়িয়ে দেন। জয় তখন অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল এই ম্যাচে আরও কিছু গোল পাবে ব্রাজিল।
বিরতির পর কিছুটা ঢিমেতালে চলতে থাকে খেলা। ব্রাজিল আক্রমণের পরিকল্পনা করতে সময় নিয়ে এগোয়। ফলে নিশ্চিত সুযোগ সেভাবে আসছিল না। ৬৩ মিনিটে উল্টো গোল হজমের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
কর্নার থেকে বক্সে বল পেয়ে এদে গোলের উদ্দেশ্যে জোরালো হেডার নেন। একেবারে কাছ থেকে আলিসনের কঠিন পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল আর তিনি প্রথম হেডারটি ফিরিয়ে দিয়ে দারুণভাবে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর দানিলো বলটি কিক করে বিপদ দূর করেন।
জোড়া গোল করা কুনিয়াকে তুলে এন্দ্রিককে নামান আনচেলত্তি। পাকেতার জায়গায় নামেন গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। এন্দ্রিক নেমে বল জালে জড়িয়ে উদযাপন করলেও অফসাইডে তা বাতিল হয়ে যায়। ম্যাচের আয়ু বাড়ার সঙ্গে দলের সেরা তারকা ভিনিসিয়ুসকে আর মাঠে রাখেননি কোচ। শেষ দিকে দানিলো সান্তোস বল লক্ষ্যে রাখতে পারেননি। বদলি নামা এদেরসন হারান সুযোগ। ফলে আর ব্যবধান বাড়াতে পারেনি সেলেসাওরা।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ফিরছেন নেইমার : হাইতিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে মাঠের ভেতরে যখন ব্রাজিলের সেলেসাওরা ‘সার্ফিং’ উৎসবে মেতেছিল, ঠিক তখনই ডাগআউট থেকে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এলো সবচেয়ে বড় ধামাকা। অবশেষে কাটল শঙ্কা, আগামী বুধবার মায়ামির মাঠে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হতে পুরোপুরি প্রস্তুত ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সির জাদুকরÑ নেইমার জুনিয়র!
হাইতি বধের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড ও ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি নিজেই এই মেগা আপডেট নিশ্চিত করেছেন। চোটের কী অবস্থা জানতে চাইলে অবলীলায় তিনি বলেন, নেইমার শনিবার ব্যক্তিগতভাবে হালকা অনুশীলন করবে। এরপর সোমবার থেকেই সে পুরো দলের সঙ্গে পুরোদমে অনুশীলনে নামবে এবং স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের জন্য একদম তৈরি থাকবে।
ডান পায়ের কাফের গ্রেড-২ ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে মাঠে নামা দূর অস্ত, দলের সাথে ফিলাডেলফিয়ায়ও যাননি নেইমার। তবে এর পেছনে ছিল ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এবং আনচেলত্তির কোচিং স্টাফের এক সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান।
নিষেধাজ্ঞার শঙ্কায় তিন ব্রাজিলিয়ান: মরক্কোর বিপক্ষে হোঁচট খাওয়ার পর হাইতির বিপক্ষে বড় জয়ে ঘুরে দাঁড়াল ব্রাজিল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জিতলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের রাউন্ডে যাওয়াটা অনেকটাই নিশ্চিত। তবে তিন ফুটবলারের হলুদ কার্ড চিন্তায় ফেলেছে কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে।
মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে হলুদ কার্ড পেয়েছিলেন ইবানেজ ও কাসেমিরো। গতকাল হাইতির বিপক্ষে হলুদ কার্ড দেখেছেন ডগলাস সান্তোস। আরেকবার কার্ড পেলে নিষেধাজ্ঞার শাস্তি পেতে হবে তাদের। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এই তিন ফুটবলারের কেউ একজন আরেকটি কার্ড দেখলেই নকআউট পর্বের প্রথম মাঠে তাদের পাবে না ব্রাজিল।
বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা বাড়ার কারণে ফিফা হলুদ কার্ড ও শাস্তির নিয়মে বড় পরিবর্তন এনেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, খেলোয়াড়দের জমে থাকা হলুদ কার্ড এখন থেকে দুটি ধাপে মুছে ফেলা হবে। গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার পর যখন নকআউট পর্ব বা দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে, তখন আগের কার্ডগুলো বাতিল হয়ে যাবে। কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেও খেলোয়াড়দের কার্ডের হিসাব আবার নতুন করে শুরু হবে।

