ঢাকা রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘে ফের আহ্বান বাংলাদেশের

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০১:৪৬ এএম

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজেদের দেশ মিয়ানমারে দ্রুত ফেরত পাঠানোর আহ্বান জাতিসংঘে আবার জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বলেছে, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে চায়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ সংকট বাংলাদেশের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। খবর বাসসের।

শুক্রবার মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেছেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী। রাষ্ট্রদূত বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর টেকসই সমাধানও সেখানেই খুঁজে বের করতে হবে।

সালাহউদ্দিন নোমান বলেন, মানবিক কারণে বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। যদিও দীর্ঘায়িত এ-সংকটের কারণে সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের এই স্থায়ী প্রতিনিধি বলেন, বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও দেশের সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধান এখন অত্যন্ত জরুরি।

সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে রাষ্ট্রদূত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

সালাহউদ্দিন নোমান বলেন, প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সংকটের মূল কারণগুলো মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও শক্তিশালী সমর্থন ও অব্যাহত মনোযোগ চান তিনি।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের দ্রুত ফেরাতে বিশ্ব ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও গুরুত্ব দেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের এই দূত। তার আগে বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গাদের নিজেদের দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ ও সহযোগিতার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সংস্থার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের মানবিক সহায়তাবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। গেল বছর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন। এ সফরে তিনি কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। এর আগের রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখতে ২০১৮ সালে একবার বাংলাদেশ সফর করেন গুতেরেস।

রোহিঙ্গাদের জন্য আরও জমি চাইল জাতিসংঘ, নাকচ বাংলাদেশের : গত সাড়ে তিন দশকে মিয়ানমার থেকে আসা ১২ লাখ রোহিঙ্গার ভার বইছে বাংলাদেশ। যাদের বসবাসের জন্য দিতে হয়েছে প্রায় ১০ হাজার একর জমি। কিন্তু নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য আরও জমি চায় জাতিসংঘ। ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। তবে নতুন করে জমি বরাদ্দ বা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মতো পরিস্থিতি নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বারবার বাংলাদেশ সরকারের কাছে নতুন আবাসন তৈরির কথা বলছে। তবে নতুন করে সম্প্রসারণের কোনো সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের নতুন করে ঘর বানিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আমাদের মধ্যে তেমন সক্রিয় আলোচনা নেই।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে স্রোতের মতো ঢুকতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। যেখানে আগে থেকেই ক্যাম্পে বসবাস করছিল আরও চার লাখ।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ওই বছরের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয় মিয়ানমারের অং সান সু চির সরকার। ওই বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেও তারা সই করে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার একপর্যায়ে ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি রোহিঙ্গারা, ফলে ভেস্তে যায় আলোচনা।

এর মধ্যে চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে কয়েকবার রোহিঙ্গাদের ফেরানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি অনেকটা আড়ালে চলে যায়। এর মধ্যে রাখাইনে যুদ্ধের কারণে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটছে। গত এক বছরে আরও এক লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে প্রবেশের তথ্য দিয়েছে সরকার। গণআন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও বড় পরিসরে সম্পৃক্ত করার কথা বলছে।