× UCB Sticker Card
রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শাহীন করিম

প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬, ০২:১৬ এএম

প্রধানমন্ত্রীর চীন-মালয়েশিয়া সফর

নতুন দিগন্তের সূচনা

শাহীন করিম

প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬, ০২:১৬ এএম

নতুন দিগন্তের সূচনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে অভূতপূর্ব সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে আনা একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব শনিবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। ঝলমলে অভ্যর্থনার মধ্যে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সেরে সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যমান সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করে সম্পর্কের নতুন যুগে প্রবেশের আকাক্সক্ষার কথা বলেছে ঢাকা ও বেইজিং। বিনিয়োগ আর আর্থিক সহযোগিতার হিসাবে বড় কোনো সংখ্যার ঘোষণা না আসার মধ্যে নতুন নতুন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলেছে উভয় দেশ। প্রস্তাব এসেছে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণ এবং কৌশলগত সহযোগিতায় নতুন মাত্রা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা তৈরির। মালয়েশিয়া-চীন সফর পররাষ্ট্র নীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা বলেও মন্তব্য করছেন অনেক বিশ্লেষক।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশ দুটির শীর্ষ নেতাদের বৈঠকগুলোই বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির। তাদের মতে, এই সফরে হওয়া সমঝোতাগুলোর ভিত্তিতে দুটি দেশের সাথেই সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সচল হলো। বিশেষ করে তারা মনে করেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু হওয়া, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর এবং চীনের সাথে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষায় ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এই সফরের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের আগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা এবং চীনের সাথে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ কিছু বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে চীন সফরের বিষয়ে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস বলেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। এ ছাড়া, চীন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন এবং মোংলা বন্দরকে আপগ্রেড, আরও বেশি প্রোগ্রেসিভ ও সার্ভিস ওরিয়েন্টেড করার জন্য চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে বৈঠকের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

মালয়েশিয়া সফরের শেষ পর্যায়ে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই জানিয়েছেন, যে তিনি আরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ, অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ, আটক বাংলাদেশিদের দেশে পাঠানো এবং একই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ করেছেন। এ ছাড়া, দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে ৯টি বিষয় উঠে এসেছিল। এতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়ানো, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি ‘বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতি’র সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে ‘হালাল শিল্পে’ সহযোগিতা বাড়াতে দুই প্রধানমন্ত্রী সম্মত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরের ‘অস্থির সময়’ পাড়ি দিয়ে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর মালয়েশিয়া ও চীনের সর্বোচ্চ নেতাদের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকই একটি ইতিবাচক বিষয়। শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকটাই একটা বড় অর্জন। এতে করে দেশ দুটির সাথে সম্পর্কের নতুন মাত্রা যোগ হলো। উভয় দেশই বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বলছিলেন চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ।

তিনি বলেন চীন ও বাংলাদেশ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক ‘টু প্লাস টু সংলাপ’ চালুর বিষয়ে আলোচনার কথা বলেছে, যা এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। মি. আহমদ বলছেন, ‘সফরে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় সবগুলো বিষয়ই আলোচনায় এসেছে। হয়তো খুঁটিনাটি পরে আসবে। তখন বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা বিষয়টিকে আরও এগিয়ে নেবেন। তবে এ সফরের বিশেষত্ব হলো টাইমিং। দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এ সফর এটি নিশ্চিত করেছে যে চীন ও বাংলাদেশ একযোগে কাজ করবে।’

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ফরিদ হোসেন বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যেসব অঙ্গীকার প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলো ইতিবাচক। তবে তার মতে, চীনের সাথে যেসব বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছে সেগুলোর কিছু বিষয়ে ভারতের যে উদ্বেগ, সেটিকে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কীভাবে ডিল করে, সেটাও দেখার বিষয় হবে। মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলে এবং অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণে অগ্রগতি হলে সফরটির অর্জন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে মালয়েশিয়া সফল মডেলে। তাদের বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসার পরিবেশ নিশ্চিত করাটা এখন সরকারের দায়িত্ব, বলছিলেন তিনি।

সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে।’ প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময়ে বলেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

জবাবে সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার জন্য। আমি যে কাজটি করার চেষ্টা করেছি, আমার অবস্থান থেকে আমার দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলা ও সেই স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। যদি ভালো কিছু অর্জন হয়, সেটি বাংলাদেশের অর্জন। এ সফরে দেশের মানুষের কোনো অর্জন হলে সেটি দেশের মানুষের অর্জন।’

‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর’: যোগাযোগ ও অর্থনীতির ‘ব্যাপ্তি বাড়াতে’ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব আবারও সামনে এনেছে বেইজিং। শুক্রবার সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন পরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দুই নেতার বৈঠকে ‘কানেক্টিভিটি’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে প্রস্তাব এসেছে, কীভাবে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি ইকোনমিক করিডর তৈরি করা যায়, যে ইকোনমিক করিডরের মূল উদ্দেশ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, ইকোনমিক ট্রানজেকশন বাড়ানো এবং মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনকে আরও এনহ্যান্স করা।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডরের ধারণা নতুন কিছু নয়। এটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অধীন একটি প্রস্তাবিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ রুট। এই করিডরের মূল লক্ষ্য হলো চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক ও কাঠামোগত সংযোগ স্থাপন।

কিন্তু চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ নিয়ে ভারতের ভূরাজনৈতিক আপত্তি ও অনীহার কারণে পরবর্তীতে বিসিআইএম প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর ভারতকে বাদ দিয়ে চীন তাদের বিদ্যমান ‘চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর’ সম্প্রসারিত করে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়। মূলত এটিই এখন সম্ভাব্য ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। এই করিডর হলে বাংলাদেশের সড়ক, রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।

বিশ্লেষক ও গবেষকদের আলোচনায় এমন করিডরের বিষয় সব সময় থাকার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক লাইলুফার বলেন, সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় মেরিটাইম ডায়ালগে গিয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে ‘কানেক্টিভিটি’ নিয়ে আলোচনা হয়। ওই জিনিসটাই আমি দেখলাম যে, এবার কথা হয়েছে, যেটা নিয়ে আমরা হয়তো অ্যাকাডেমিক লেভেলে অনেকবারই বলেছি। এটা একটা ‘মেজর ডেভেলপমেন্ট’ আমি বলব।

‘টু প্লাস টু বেশ তাৎপর্যপূর্ণ’: বাংলাদেশের সামরিক কেনাকাটার বড় অংশ চীন থেকেই আসে। দুই দেশের প্রতিরক্ষা খাতে বিস্তৃত সহযোগিতাও রয়েছে। কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নেওয়ার যাত্রায় দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার কাঠামোগত প্রক্রিয়া তৈরির উপায় অনুসন্ধানের কথা বলেছে ঢাকা ও বেইজিং। ‘টু প্লাস টু’ নামে পরিচিতি এ কাঠামোগত প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়া এবং কম্বোডিয়ার সঙ্গে তৈরি করেছে চীন। আর একই ধরনের প্রক্রিয়ার কথা চলতি মাসে বলেছে তুরস্ক ও বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, “ফরেন এবং ডিফেন্সÑ এ দুটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ‘ফর দ্য ফার্স্ট টাইম’ বাংলাদেশের সাথে চায়নার ‘টু প্লাস টু’ একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। যেখানে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিধি যারা রয়েছেন, ওনাদের নিয়মিত আলোচনার ভিত্তিতে সামনের দিনগুলোতে সংলাপ শুরু হবে। এই ‘ইনস্ট্রুমেন্টের ডিটেইলস’টা ‘ওয়ার্কআউট’ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সভরেন্টি বা সার্বভৌমত্ব ইনডিপেনডেন্স বা স্বাধীনতা এবং ‘টেরিটরি ইন্টিগ্রিটি’কে সম্মান জানিয়ে চীন বলেছে, “গণতন্ত্র ব্যবস্থায় বাংলাদেশে যেভাবে গণমানুষের আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে একটি সরকারের, যেটির পররাষ্ট্রনীতি হবে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের বহিঃপ্রকাশ, সেটি নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশও চায় যেমন স্বাধীন সার্বভৌম থাকতে, চীনও চায় তার মতো করে স্বাধীন-সার্বভৌমভাবে দেশ পরিচালনা করতে। এটা একটা ‘গ্লোবাল ভ্যালু’, যেটা আমরা ‘হোল্ড’ করতে চাচ্ছি।”

এটাকে সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে অভিহিত করে অধ্যাপক লাইলুফার বলেন, “আমি বলব যে এই ‘টু প্লাস টু ফর্মুলা’টা তখনই ‘অ্যাপ্লাই’ করা হয়, যখন একটা রাষ্ট্রকে আমরা সেইভাবে করে তার কৌশলগত তাৎপর্য আছে, সেই জিনিসটা বুঝতে পারি।”

তিনি বলেন, “যখন একটা দেশের কৌশলগত গুরুত্বটাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং একটা দেশ জানে যে, আমি আরেকটা দেশের সাথে কোঅপারেট করলে একটা ‘উইন-উইন সিচুয়েশন ক্রিয়েট’ হবে, দুইটা দেশের জন্যই, তখন করা হয়। সেই জন্য আপনি দেখবেন যে, চীন তার অঞ্চলের দেশ থেকে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ‘অফিশিয়ালি সাউথ এশিয়া’তে না হলেও কিন্তু ১০০ কিলোমিটারের কম দূরত্বে এবং বাংলাদেশের আরেকটা জিনিস আমার লেখাটা আমি যেটা দিচ্ছি যে, ‘বে অফ বেঙ্গল’, বাংলাদেশের উপসাগর, সেখানে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বটা চীনসহ অন্যান্য দেশ ধরতে পারছে এবং সেটা আরেকটা বড় কারণ।”

কৌশলগত অবস্থানের কারণে জাপানের ‘ওভারসিস সিকিউরিটি কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্টে’ও বাংলাদেশ থাকার কথা তুলে ধরে এই বিশ্লেষক বলেন, “এখানে অনেকেই অনেকটা না বুঝে বারবার বলার চেষ্টা করেন যে, বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব নাই। কিন্তু বাংলাদেশের যে ‘অর্গানিক স্ট্র্যাটেজিক সিগনিফিকেন্স’ আছে, ‘ন্যাচারাল স্ট্রাটেজিক সিগনিফিকেন্স’ আছে, সেটা আমরা বারবার দেখছি যে অন্য রাষ্ট্রগুলো আমাদেরকে এটা বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভেতর থেকে সচেতনতা নাই।”

আলোচনায় এসেছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা : প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি। এতে বলা হয়েছে, সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা, পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে দুই দেশ।

চীন জানিয়েছে, নিজেদের ‘সক্ষমতা অনুযায়ী’ তারা তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা করবে এবং প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই দ্রুত সম্পন্ন করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা দেবে। এ ছাড়া সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।

তিস্তা প্রকল্পে বড় রকমের কোনো অগ্রগতি না হলেও এর বাস্তবায়ন চীনের হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়ার কথা তুলে ধরে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ বলেন, ‘এটা তো এর মধ্যে নতুন কিছু পাচ্ছে না। কিন্তু নিশ্চিতভাবে আমাদের তিস্তা প্রকল্প যদি হয়, তাহলে চীনকে নিয়েই আমরা করব, এটাই স্বাভাবিক। ওদের সেই অভিজ্ঞতা আছে, ওদের সেই দক্ষতা আছে এবং আমাদের সরকার চাচ্ছে সেটা করতে। কিন্তু এইবারে কোনো রকমের চুক্তি করে নাই, এ ব্যাপারে এটুকু বোঝা যাচ্ছে।’

২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় চীনের অর্থায়নেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পাঁচ বছরমেয়াদি প্রথম ধাপের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা (৭৫০ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ৫৫০ মিলিয়ন ডলার চীনের কাছে ঋণ হিসেবে চাওয়া হয়েছে এবং বাকি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মেটানো হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে চীনের সঙ্গে প্রকল্পটির বিষয়ে সহযোগিতার ব্যাপারে সমঝোতা হয়। তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের ‘উদ্বেগের’ প্রসঙ্গে শুক্রবার এক প্রশ্নে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন কৌশলের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তৃত করতে প্রস্তুত আছে চীন। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও বাণিজ্য, পানি সংরক্ষণ ও জীবিকার মতো ক্ষেত্রে আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়াতে চায়।

তিনি বলেন, “জীবিকার সঙ্গে জড়িত তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে কী করা যায়, তার জন্য প্রস্তুত আছে চীন। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ মুক্ত থাকা উচিত।”

ঢাকা-বেইজিং ১৫ দফা যৌথ ঘোষণায় সম্পর্ক নতুন যুগে নেওয়ার বার্তা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর শেষে দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। শুক্রবার প্রকাশিত ১৫ দফার এই যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, দুই দেশ তাদের ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ আরও এগিয়ে নিয়ে ‘নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গড়ে তুলবে, যাতে দুই দেশের জনগণ আরও বেশি উপকৃত হয়।

বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহায়তা এবং দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর মতো বিষয় যৌথ ঘোষণায় এসেছে। এ ছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং সামরিক খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি; চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার আলোচনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে আলোচনায় আনতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীন।

উচ্চ পর্যায়ের সংলাপ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত : দুই দেশ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা, সরকারি পর্যায়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু+টু সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনাও যৌথভাবে খতিয়ে দেখবে ঢাকা ও বেইজিং।

‘এক চীন’নীতিতে বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত :  প্রধানমন্ত্রীর সফরে যৌথ ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশ ‘এক চীন’নীতির প্রতি দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিং সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার। বাংলাদেশ তাইওয়ানের স্বাধীনতার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এবং জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণে চীনের উদ্যোগকে সমর্থন জানায়।

অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখ-তার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। চীন বলেছে, বাংলাদেশের জনগণ তাদের জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছে, তাকে তারা সম্মান করে।

বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প খাতে সহযোগিতা : যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে বাংলাদেশ ও চীন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানিসক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতেও একসঙ্গে কাজ করবে দুই দেশ। বাংলাদেশের সব ধরনের পণ্যের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা বজায় রাখায় চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা। দুই দেশ যৌথভাবে মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

ব্রিকস ও এসসিওতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে চীনের সমর্থন : যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, মানবজাতির জন্য ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গঠনের ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উত্থাপিত বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থাকার কথাও বলেছে ঢাকা।

অন্যদিকে, চীন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামে বাংলাদেশের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের আবেদনে সমর্থনের কথা জানিয়েছে বেইজিং। এ ছাড়া আঞ্চলিক বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া এবং এ প্রক্রিয়ায় আরও দেশকে যুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুই দেশ।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!