ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী

ঋণনির্ভর নয়, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৫:৩৮ এএম

দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও লুণ্ঠিত আর্থিক খাত সংস্কার করে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি ঘোষণা করেছেন, বাংলাদেশ এখন ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু করেছে। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।

গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। এ সময় মন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে আমরা শুধু একটি অর্থনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করছি। বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই বাজেট শুধু সরকারের বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি নয়; এটি জনজীবনে স্বস্তি আনা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কাঠামোগত সংস্কার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের রূপরেখা। তিনি উল্লেখ করেন, উত্তরাধিকার হিসেবে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পেলেও বর্তমান সরকারের ৩আর (রিকভারি, রেস্টোরেশন, রিকন্সট্রাকশন) কৌশলের মাধ্যমে দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অনেকের সংশয়ের জবাব দেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে আমরা শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি। মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৬০টি পণ্যের উৎসে কর হ্রাস এবং সরবরাহব্যবস্থার ত্রুটি দূর করার মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।’

প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি আস্থার প্রতিফলন। আইসিটি, কৃষি ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে অর্থনীতির মূলধারায় এনে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।’

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে আমির খসরু বলেন, ‘আমরা করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং করের ভিত্তি বাড়িয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চাই। প্রথমবারের মতো এনবিআর ৪ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধে আমরা ফ্ল্যাট রেটে ভ্যাট প্রদানের সুযোগ দিচ্ছি, তবে কাঁচাবাজার ও মুদি দোকান এর আওতার বাইরে থাকবে।’

তিনি আরও জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ৩৩.৭০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগে ছিল ২৭.২৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিগত সরকারের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকার অপ্রয়োজনে ঋণ নিয়ে দেশের ঋণধারণ সক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বর্তমানে মোট ঋণের পরিমাণ ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা জিডিপির ৩৮.৬১ শতাংশ। এই ঋণের সুদ আমাদের সময়মতো পরিশোধ করতে হচ্ছে।’

এই সংকট কাটাতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিচ্ছি। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিকল্প অর্থায়ন হিসেবে হংকং, লন্ডন ও নিউ ইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

পাচার করা অর্থ ফেরানোর বিষয়ে আমির খসরু দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘জনগণের টাকা যারা আত্মসাৎ করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। ১৩টি দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।’