রক্তস্নাত স্মৃতির মিনার বেয়ে, বৈষম্যের শেকল ভেঙে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর মাস শুরু হচ্ছে কাল। আগামীকাল ১ জুলাই। ২০২৪ সালে এই জুলাইয়েই সূচিত হয় স্বৈরাচার পতনের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলন। শুরুতে দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস আর রক্তের লিখনে ভরা এই জুলাই মাসটি ত্যাগ ও প্রাপ্তির এক অনন্য যুগলবন্দি। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ যেমন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, তেমনি ২০২৪ সালের জুলাইও যুক্ত হয়েছে নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায় হিসেবে। এই মাস একই সঙ্গে বেদনার, প্রতিরোধের এবং পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়ে এসে আজও একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর পরিষ্কারভাবে মেলেনি। সেটি হচ্ছে, এই আন্দোলনে প্রাণত্যাগের সঠিক পরিসংখ্যান। সরকারি তথ্য এক, আন্দোলনকারীদের তথ্য আরেক। ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্তির যে মাস; যে জুলাই বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসÑ সেই ইতিহাস সৃষ্টি করতে প্রাণত্যাগীদের সঠিক পরিসংখ্যানই নেই।
জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সরকারের তরফ থেকে নিহতের ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রাথমিক তথ্যমতে এই আন্দোলনে মোট ১ হাজার ৫৮১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৬৫০ থেকে ৯৮৬-এর মধ্যে। অপরদিকে সর্বশেষ যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের পর সরকারিভাবে প্রকাশিত গেজেটে ৮৩৬ জনকে ‘শহিদ’ হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা দেশে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এবং জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর সমন্বিত প্রতিবেদন অনুসারে, নিহতের তালিকায় কমপক্ষে ২৬৫ জন বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী রয়েছেন। অভ্যুত্থানে ১৩৩ জন শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্ক শহিদ হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১৭ জনই সরাসরি পুলিশের গুলিতে শহিদ হন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্যমতে, আন্দোলনজুড়ে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন। গুলিতে চোখে গুরুতর আঘাত পেয়ে ৪০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা প্রায়ই বলেন, আসলে সঠিক পরিসংখ্যান বের করাটা অনেক জটিল একটি কাজ। মাত্র তো দুই বছর পার হলো। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে কতজন শহিদ হয়েছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান কি আজ পর্যন্ত জানা গেছে? তবে সময়ের দাবি, এর একটা সঠিক পরিসংখ্যান বের হওয়া দরকার।
২০২৪ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এবং রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জড়ো হওয়া হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষার্থীর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল অধিকার আদায়ের স্লোগান। বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট স্ফুলিঙ্গটিই রূপ নিয়েছিল এক অদম্য গণঅভ্যুত্থানে। ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের দেয়াল ভেঙে পড়ে সেই আন্দোলনে। জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে বুলেট আর রক্তস্রোত দিয়ে লেখা হয়েছে সাহসিকতার নতুন উপাখ্যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ সারা দেশের আপামর ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে এসেছিলেন। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের রক্তের ঢলে কেঁপে ওঠে ফ্যাসিবাদী সরকারের ভিত। আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ নাম-না-জানা অসংখ্য শহিদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের দাম কতখানি। এখন আমাদের খুঁজে বের করতে হবে যারা আত্মত্যাগ করে এই নতুন স্বধীনতা এনে দিয়েছেন, তাদের পরিবারগুলো কেমন আছে, কতটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে তাদের। শুধু স্মরণ করলেই চলবে না, করতে হবে যথার্থ মূল্যায়নও। পাশাপাশি আমরা হাজার সমন্বয়কের মধ্যে মাত্র কজনার নাম জানি। কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারে গিয়েছিলেন। কেউ এখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। কেউ কেউ সংসদেও আছেন। আর বাকিরা? তারা কে কোথায় কেমন আছেন, কীভাবে আছেনÑ সে খবর কতটা রাখা হচ্ছে? তাদের মূল্যায়নটাও।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সার্বিকভাবে সমন্বয়করা এখন আর আগের মতো একক ও অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নেই। তারা কেউ কেউ নতুন রাজনৈতিক দলের ছাতার নিচে এলেও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং ভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় যুক্ত হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে ভাঙন ও মেরূকরণ স্পষ্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল প্ল্যাটফর্ম থেকে অনেক সমন্বয়ক সরে গেছেন।
গত বছরের মতো এবারও হয়তো অনুষ্ঠানমালা পালন হবে। এটা হওয়া দরকার। স্মৃতি উদযাপনের মাসজুড়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। এটা করাও উচিত। এই আত্মত্যাগকে চিরভাস্বর করে রাখতে কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সব মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জাসহ বিভিন্ন উপাসনালয়ে শহিদদের স্মরণে দোয়া ও প্রার্থনাও করা হবে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, এই মাস কেবল কান্নার নয়; এই মাস মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অহংকার করার মাসও। জাতি হিসেবে আমাদের অনেক ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই নতুন এক স্বাধীনতা। সেই সঙ্গে প্রাপ্তি হয়েছে স্বৈরাচারমুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশে। তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃশ্যপটকে চিরতরে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর তাই ১ জুলাই বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ঐতিহাসিক মাসে দাঁড়িয়ে শপথ নেওয়ার সময় এসেছে। শহিদদের রক্তে অর্জিত এই স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই ভূলুণ্ঠিত না হয়। জুলাইয়ের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে এগিয়ে যাই। জুলাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিও। ত্যাগের ঋণ, প্রাপ্তির দায় এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়েই শুরু হোক আরেকটি জুলাই। আর সবারই যেন প্রচেষ্টা হয়, এই অর্জনের পেছনে যাদের অবদান তাদের যেন সঠিকভাবে চিহ্নিত বা শনাক্ত করা হয় এবং প্রাপ্য সম্মাননাটুকু তারা যেন পান। শহিদ পরিবারগুলোও যেন প্রকৃত মূল্যায়ন পায়। সেই সঙ্গে শহিদদের প্রকৃত তালিকাটাও যেন প্রকাশ পায়।

