যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমবেÑ এমন প্রত্যাশা ছিল আন্তর্জাতিক মহলের। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কাতারে প্রতিনিধি পাঠিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসেনি ইরান। একই সঙ্গে দেশটির সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হলে আলোচনা এগোবে না। প্রয়োজন হলে যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে তেহরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও ইসরায়েল আবারও ইরানে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
কাতারের রাজধানী দোহাকে ঘিরে কয়েক দিন ধরেই কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধিরা সেখানে পৌঁছানোর পর ধারণা করা হয়েছিল, দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফার উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ইরান শুরু থেকেই জানিয়ে দেয়, প্রতিনিধি পাঠানো মানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসা নয়। তাদের মতে, যুদ্ধবিরতির শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি না হলে নতুন কোনো রাজনৈতিক আলোচনা অর্থহীন।
ইরানি সংসদের স্পিকার বলেন, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতার প্রতিটি শর্ত বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী চুক্তির আলোচনা এগোবে না। তার অভিযোগ, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। তাই এবার শুধু কথার ওপর ভরসা করতে রাজি নয় তেহরান। তিনি বলেন, ‘আলোচনা চলবে, তবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে ইরান তার জবাব দিতেও প্রস্তুত।’
ইরানের দাবি, যুদ্ধবিরতির পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত বাধা শিথিল হওয়ায় দেশটি আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি শুরু করেছে। তেহরানের ভাষ্য, সমঝোতার পর থেকে কয়েক কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে। তবে সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিমত তেহরানের। সে কারণেই নতুন চুক্তির বিষয়ে তারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
চলমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থানে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালির সার্বভৌম অধিকার তাদের এবং ওমানের। এই জলপথে চলাচলের নিয়ম নির্ধারণের অধিকারও তাদের থাকবে। নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর প্রয়োজন হলে প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে মাসুল আদায়ের কথাও জানিয়েছে তারা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক এই নৌপথে কোনো ধরনের মাসুল আরোপ মেনে নেওয়া হবে না। ওয়াশিংটনের মতে, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে। এই ইস্যুতেই দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযানের বিভিন্ন সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিলেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার আশঙ্কা, নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে শুধু আলোচনাই ভেস্তে যাবে না, বরং পুরো অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস কমেনি। যুদ্ধবিরতির পরও একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ চলছে। মাঝেমধ্যে সীমিত সামরিক তৎপরতার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়াতে কেউ আগ্রহী নয়। তবে চাপ সৃষ্টি এবং দর-কষাকষিতে সুবিধা আদায়ের জন্য উভয় পক্ষই কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইসরায়েলের অবস্থান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, প্রয়োজন হলে আবারও ইরানে সামরিক অভিযান চালানো হবে। তার দাবি, কোনো অবস্থাতেই ইরানকে পরমাণু অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তিনি গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখারও ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও নতুন সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা।
ইসরায়েলের এই অবস্থান নিয়ে ইরানও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তেহরানের মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতাও বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না।
এদিকে কাতারে সরাসরি বৈঠক না হলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জব্দ অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কÑ এসব বিষয় নিয়ে পৃথক কর্মদল কাজ করছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব আলোচনা থেকে দ্রুত কোনো যুগান্তকারী ফল আসবে, এমন আশা এখনই করছেন না সংশ্লিষ্টরা।
এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ববাজারেও। আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ আবারও ব্যাহত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কূটনীতিকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পারস্পরিক আস্থার সংকট দূর করা। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি এতটাই গভীর যে, সামান্য উসকানিও নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। তাই আলোচনার পাশাপাশি সমঝোতার প্রতিটি শর্ত বাস্তবায়নের ওপরই এখন জোর দিচ্ছে উভয় পক্ষ।
যুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি। সেই বাস্তবতায় আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি ঠিকই, কিন্তু শান্তির পথও এখনো মসৃণ নয়। কাতারে মুখোমুখি বৈঠক না হওয়া, হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধ, ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পারস্পরিক অবিশ্বাসÑ সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা নতুন মোড় নিয়েছে। এখন নজর আগামী কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে। কারণ, সেই আলোচনা সফল হলে সংঘাত আরও দূরে সরে যেতে পারে, আর ব্যর্থ হলে অঞ্চলটি আবারও বড় ধরনের সামরিক সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন