কাতারের রাজধানী দোহায় দুই দিনব্যাপী পরোক্ষ বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ নতুন গতি পেলেও উভয়পক্ষের অবস্থানে এখনো সতর্কতা স্পষ্ট। মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তানের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে যুদ্ধবিরতির শর্ত বাস্তবায়ন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল, ইরানের জব্দকৃত অর্থ অবমুক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার পর উভয়পক্ষ আগামী ১৮ জুলাই আবারও বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক আলোচনায় কয়েকটি বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পরই পরবর্তী বৈঠকের সময় নির্ধারণের বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছিল। পরে জানা যায়, নতুন দফার আলোচনা ১৮ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে।
বিরোধের কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালি :
আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালি। বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করতে চায় তেহরান। ইরানের অবস্থান হলো, অন্তর্বর্তী সমঝোতার আওতায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিনা মাশুলে জাহাজ চলাচল করলেও ভবিষ্যতে কোন জাহাজ কোন পথে চলবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদেরই থাকবে।
ইরান জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে জাহাজ থেকে মাশুল আদায়ের বিষয়টিও কার্যকর করা হতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রয়োজন মনে করলে নির্দিষ্ট জাহাজের চলাচল সীমিত করার ক্ষমতাও নিজেদের হাতে রাখতে চায় তারা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অবস্থানের বিরোধিতা করে বলেছে, আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ চলাচলের অধিকার কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে সীমিত করতে পারে না। ওয়াশিংটনের মতে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের নীতির পরিপন্থি।
সমঝোতা বাস্তবায়ন না হলে আলোচনাও নয় :
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে নতুন কোনো চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা এগোবে না। তার ভাষায়, সংলাপের পথ খোলা থাকলেও প্রয়োজন হলে যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে তেহরান।
তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার কোনো অবস্থাতেই ছাড় দেওয়া হবে না। অন্তর্বর্তী চুক্তির সময়সীমা শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।
নৌ চলাচলে নতুন নির্দেশ :
হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী সব তেলবাহী জাহাজকে ইরানের নির্ধারিত পথ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। এই নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ইরানের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের নৌ-নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে না। একই সঙ্গে প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকেও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে তেহরান।
আলোচনায় নেই পরমাণু কর্মসূচি :
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দোহার বৈঠকে পরমাণু ইস্যু কার্যত আলোচনায় ওঠেনি।
ইরানের প্রতিনিধি দলের প্রধান কাজেম গারিবাবাদি বৈঠক শেষ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও মতপার্থক্য কতটা কমেছে, সে বিষয়ে কিছু জানাননি। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বলেছেন, পরমাণু ইস্যু নিয়ে পরে পৃথক আলোচনা হবে।
দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা :
সাম্প্রতিক বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, ভবিষ্যতে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ দ্রুত জানানো এবং তাৎক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে একটি বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা হবে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি কমানো এবং নতুন সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করা হবে। এছাড়া ইরানের জব্দকৃত অর্থের একটি অংশ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির কাজে ব্যবহারের বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরও আত্মবিশ^াসী তেহরান :
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের বহু সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং শিল্প অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেহরান এখনো আত্মবিশ্বাসী অবস্থান ধরে রেখেছে। বিভিন্ন সামরিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরানের অনেক ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এখনো সচল রয়েছে। হামলার পরও এসব স্থাপনার উল্লেখযোগ্য অংশ দ্রুত পুনরায় চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে ড্রোন উৎপাদন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুতিও আবার শুরু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ইরানের সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করছে। বিশেষ করে ছোট যুদ্ধজাহাজ, দ্রুতগতির নৌযান, ড্রোন এবং উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
নতুন সংঘাতের আশঙ্কা :
আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সতর্ক আশাবাদ থাকলেও উভয়পক্ষই নতুন সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আবারও হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এর জবাবে ইরানও পাল্টা কঠোর প্রতিক্রিয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকলেও আস্থার ঘাটতি এখনো কাটেনি। হরমুজ প্রণালি, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে সমঝোতা না হলে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়তে পারে।
সামনে কী :
আগামী ১৮ জুলাইয়ের বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বৈঠকে অন্তর্বর্তী সমঝোতার বাস্তব অগ্রগতি, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের নিয়ম, জব্দকৃত অর্থ অবমুক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো দীর্ঘ। উভয়পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নে বড় ধরনের সমঝোতা ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সহজ হবে না। তাই আলোচনার টেবিলে ইতিবাচক সংকেত মিললেও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।

