বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচজন বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। এটি বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক, নির্বাচনি ও জাতীয় অঙ্গীকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির আন্দোলনের ফসল।
এর আগে, বুধবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়। টানা তিন দিন শুনানি শেষে রায়ের জন্য গতকাল দিন ধার্য করা হয়। রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে রায় ঘোষণা করেছেন আপিল বিভাগ। ফলে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকছে।
তিনি বলেন, হাইকোর্ট ডিভিশনের রায় বহাল। অর্থাৎ সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদ বাতিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল, গণভোট পুনর্বহাল এবং মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষমতা একমাত্র সুপ্রিম কোর্টের কাছেই থাকবে বলে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন; সেগুলো বহাল থাকল।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ ছাড়াও হাইকোর্ট রায়ে বলেছিলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীতে অন্যান্য যত পরিবর্তন আনা হয়েছিল সেই বিষয়ে জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নিবে।’ এটিও বহাল থাকল। তিনি বলেন, রায়ের ফলে সংবিধানে ফিরল গণভোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। আপিল বিভাগ বলেছেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা বাকি পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এখন জাতীয় সংসদের।
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে পাস হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। একই বছরের ৩ জুলাই এতে রাষ্ট্রপতির সম্মতি মেলে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহাল করা হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়। সংসদ নির্বাচনের সময়সূচিও পরিবর্তন করে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিক পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। ওই বছরের ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চান, কেন এ সংশোধনীকে সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করা হবে না।
পরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, গণফোরাম এবং আরও কয়েকজন ব্যক্তি ও সংগঠন মামলায় বাদি হন। মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও পৃথক একটি রিট করেন।
শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত বিধান, সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদ, মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত ৪৪(২) অনুচ্ছেদ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটসংক্রান্ত বিধান বাতিলের অংশসহ কয়েকটি বিধান অবৈধ ঘোষণা করেন। এরপর বদিউল আলম মজুমদার ও অন্যরা, মো. মোফাজ্জল হোসেন এবং মিয়া গোলাম পরওয়ার আপিলের অনুমতি চান। তাদের আইনজীবীরা আপিল বিভাগে যুক্তি দেন, পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল করা উচিত।
গতকালের রায়ে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। এর ফলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাদ দেওয়া সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিধান পুনর্বহাল হলো।
‘আগামী সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে’ : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এটি বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক, নির্বাচনি ও জাতীয় অঙ্গীকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির আন্দোলনের ফসল।’
গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এ কথা বলেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রের কবর রচনা করে ফ্যাসিবাদের নীল নকশা তৈরি করা হয়েছিল। আমরা শুরু থেকেই বলেছিলাম এটি ‘আল্ট্রা ভাইরাস’ (সংবিধান পরিপন্থি)। হাইকোর্ট বিভাগ এই সংশোধনীর কিছু বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেছেন এবং বাকি বিষয়গুলো জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন। সুতরাং, হাইকোর্টের রায় এখন চূড়ান্ত।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে মন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে। এটি বিএনপির দীর্ঘ ১৬ থেকে ১৭ বছরের আন্দোলনের ফসল। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও’ সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল-যেন মানুষ তার নিজের ভোট নিজে দিতে পারে।’
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘রায়ের আলোকে পাবলিক কনসালটেশন (জনমত যাচাই) ও রেফারেন্ডামের (গণভোট) মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত কাঠামো তৈরি করা হবে।’ আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে রায়টি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। রায়ে যে ৫৪টি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে, তার সবকটি আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অ্যাড্রেস করব। এ ক্ষেত্রে আমাদের মূল বিবেচ্য বিষয় থাকবে ‘জুলাই সনদ’। জুলাই জাতীয় সনদকে সামনে রেখে এ বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে যা যা সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন প্রয়োজনÑ সব করা হবে।’
‘যুগের পরিবর্তনে সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হয়’ : পঞ্চদশ সংশোধনী আইন নিয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে গতকাল প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ রায় দেন। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মো. শিশির মনির বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর রায়ে হাইকোর্ট চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, যা আপিল বিভাগের বহাল থাকল। যে বিষয়গুলো অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিলÑ সংবিধানের কিছু বিষয় পরিবর্তন করলে তা হবে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা, গণভোটের বিধান বাতিল, নি¤œ আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল।
তিনি বলেন, চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হলো। এ ছাড়া বাকি যে বিষয়গুলো ছিল এগুলো মহান জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সংবিধান কোনো দ-বিধি না। কেউ যদি অপরাধ করে অপরাধ ডিটারমিন করবে দ-বিধি। প্রসেস ফলো করবে ফৌজদারি কার্যবিধি। পৃথিবীর কোনো সংবিধানে শাস্তির কথা বলা থাকে না। আর সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে নাÑ এটা সঠিক সিদ্ধান্ত না। ৫০ বছর পরে আমরা কেউই থাকব না, নতুন জেনারেশন আসবে, আন্ডারস্ট্যান্ডিং হবে, এডুকেশন হবে। এ জন্য সংবিধানকে বলা হয় লিভিং ডকুমেন্ট। এটি সময় যুগের সঙ্গে পরিবর্তন আনতে হয়। যদি বলি কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। তার মানে কি এটা বাইবেল? এটা কি কোরআন? আনসার ইজ নো। এ জন্য এই পার্টটুকু বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন